গ্রিনল্যান্ড নিরাপত্তা ও মিউনিখ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে ন্যাটোর 'আর্কটিক সেন্ট্রি' মিশনের প্রস্তুতি

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো বর্তমানে তাদের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হাই নর্থ' বা সুদূর উত্তর অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে 'আর্কটিক সেন্ট্রি' (Arctic Sentry) নামক একটি নতুন এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা মিশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এই বিশেষ উদ্যোগটি এমন এক সময়ে গ্রহণ করা হয়েছে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের সম্ভাবনা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কূটনৈতিক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মূলত আর্কটিক অঞ্চলের আকাশসীমা এবং সামুদ্রিক ডোমেইনগুলোতে নিবিড় নজরদারি, সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধ এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই মিশনটি নকশা করা হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে যে, এই সপ্তাহের মধ্যেই মিশনের আনুষ্ঠানিক যাত্রার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

'আর্কটিক সেন্ট্রি' মিশনটি মূলত ন্যাটোর পূর্ববর্তী সফল অপারেশন যেমন 'বাল্টিক সেন্ট্রি' এবং 'ইস্টার্ন সেন্ট্রি'র আদলে তৈরি করা হয়েছে, যা মূলত সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ কেবল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শত্রুপক্ষের ড্রোন তৎপরতা মোকাবিলার জন্য চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে আর্কটিক অঞ্চলের আটটি দেশের মধ্যে সাতটিই ন্যাটোর পূর্ণ সদস্য হওয়ায় এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, যেখানে রাশিয়া এখন একমাত্র প্রধান অ-সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১৯৫১ সালের সেই ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়নের জন্য আলোচনা শুরু করেছে, যা মূলত গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং কার্যক্রম পরিচালনার আইনি ভিত্তি প্রদান করে।

ন্যাটোর সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ইউরোপ (SACEUR) হিসেবে দায়িত্বরত মার্কিন জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ এখন থেকে সমস্ত মিত্র রাষ্ট্রের সর্বসম্মত অনুমোদনের অপেক্ষা না করেই এই ধরনের বর্ধিত নজরদারি এবং নিরাপত্তা কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করবেন। ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ট্রোয়েলস লুন্ড পোলসেন ন্যাটোর এই নতুন পরিকল্পনাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছেন যে, আর্কটিক এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ন্যাটোর মিত্রদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা বর্তমান সময়ে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর্কটিক অঞ্চলের এই উত্তেজনার পাশাপাশি, ২০২৬ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন (MSC) যা আগামী ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেখানে 'আন্ডার ডেসট্রাকশন' (Under Destruction) শিরোনামে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে 'রেকিং বল পলিটিক্স' বা ধ্বংসাত্মক রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনা সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে, যেখানে প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কারের পরিবর্তে সেগুলোকে আমূল ভেঙে ফেলার এক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমএসসি ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট উলফগ্যাং ইশিঙ্গার তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার প্রধান স্থপতি হয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন মনে করছে যে এই বিদ্যমান ব্যবস্থা আর তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে না, যা ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা স্বয়ংসম্পূর্ণ করার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এই গভীর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতেও বড় ধরনের বিনিয়োগের জোয়ার নিয়ে এসেছে। নরওয়ে সরকার সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, তারা তাদের নবগঠিত রকেট ব্যাটালিয়নের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার অত্যাধুনিক 'চুনমু' (Chunmoo) রকেট সিস্টেম ক্রয়ে প্রায় ১৯ বিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রোন বা ১.৬৫ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। বারডুফসে অবস্থিত এই বিশেষ ব্যাটালিয়নটিতে প্রায় ৭৫০ জন প্রশিক্ষিত সৈন্য মোতায়েন করা হবে এবং এই রকেট সিস্টেমটি রাশিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোলা উপদ্বীপের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। এই পদক্ষেপটি মূলত উত্তর ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যুহকে আরও দুর্ভেদ্য করে তোলার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আসন্ন মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের মূল পর্বে জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে প্রথমবারের মতো ফ্রিডরিখ মার্জের অংশগ্রহণ এবং মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অনুপস্থিতি, যিনি এর আগে ২০২৫ সালের সম্মেলনে ইউরোপীয় মিত্রদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তারা তাদের মৌলিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। ভ্যান্সের এই অনুপস্থিতি এবং নতুন মার্কিন প্রশাসনের প্রতিনিধি দলের গঠন আটলান্টিক-পারের দেশগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

2 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Reuters

  • Deutsche Welle

  • Canadian Affairs

  • ArcticToday

  • Government.se

  • The Arctic Institute – Center for Circumpolar Security Studies

  • Munich Security Conference 2026

  • Munich Security Conference 2026 | Digital Watch Observatory

  • An era of 'wrecking ball' politics: What the Munich Security Report says about Canada's moment of reckoning | CBC News

  • Vice President JD Vance - The White House

  • 2025 Nobel Peace Prize - Wikipedia

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।