কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও কাতারের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করছেন

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

২০২৫ সালের ১৪ মার্চ কানাডার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন মার্ক কার্নি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি দেশটির বিশ্ব বাণিজ্য কাঠামো পুনর্গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কানাডার যে চরম অর্থনৈতিক নির্ভরতা রয়েছে, তা কমিয়ে আনাই তার প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতির প্রতিক্রিয়ায় এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ট্রাম্প এর আগে কানাডীয় পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের '৫১তম অঙ্গরাজ্য' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অফ কানাডা এবং ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কার্নি তার বিশাল আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছেন।

কানাডা সরকারের বর্তমান লক্ষ্য হলো আগামী এক দশকের মধ্যে অ-মার্কিন রপ্তানির পরিমাণ দ্বিগুণ করা। বর্তমানে কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যা থেকে সরে এসে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে চাইছেন কার্নি। এই বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে তিনি সম্প্রতি বেইজিং সফর করেন, যা ২০১৭ সালের পর কোনো কানাডীয় সরকার প্রধানের প্রথম চীন সফর। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ বাণিজ্য বাধা হ্রাসে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে উপনীত হয়েছে।

এই চুক্তির আওতায় চীন ২০২৬ সালের ১ মার্চের মধ্যে কানাডীয় ক্যানোলা বীজের ওপর আমদানি শুল্ক ৮৪ শতাংশ (বা ৭৫.৮ শতাংশ) থেকে কমিয়ে প্রায় ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত কানাডীয় সরিষার গুঁড়ো, মটরশুঁটি, লবস্টার এবং কাঁকড়ার ওপর থেকে বৈষম্যমূলক শুল্ক প্রত্যাহারেও বেইজিং সম্মত হয়েছে। বিনিময়ে কানাডা ২০২৪ সালে আরোপিত তাদের রক্ষণশীল নীতি শিথিল করেছে। এখন থেকে ৪৯,০০০ চীনা বৈদ্যুতিক যানের ওপর ১০০ শতাংশের পরিবর্তে মাত্র ৬.১ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। এই কৃষি সংক্রান্ত ছাড়ের ফলে কানাডার প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

এশিয়ার পাশাপাশি কার্নি মধ্যপ্রাচ্যের দিকেও নজর দিয়েছেন। ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি কাতারের দোহা সফর করেন, যেখানে দুই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি কৌশলগত জোট গঠিত হয়। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং জ্বালানি খাতে কাতারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। দোহায় অবস্থানকালে কার্নি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে কেন্দ্র করে ন্যাটো মিত্রদের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং কানাডার সার্বভৌমত্বের প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ নিশ্চিত করেছেন যে, অটোয়া এখন ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মারকোসুর (MERCOSUR) দেশসমূহ, সৌদি আরব এবং ভারতের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নে মনোনিবেশ করছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। যদিও ক্যানোলা রপ্তানিকারকদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ, যারা ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস দেখেছিলেন, তবুও চীনের অর্থনৈতিক বলয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিয়ে কিছু সতর্কতা রয়ে গেছে। বেইজিংয়ের বৈঠকে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যা এই আলোচনার একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও জলবায়ুগত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির এই সাহসী পদক্ষেপ কানাডার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্ববাজারের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের পণ্যের বাজার তৈরি করা এখন কানাডার প্রধান অগ্রাধিকার। এই নতুন কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে কানাডার অর্থনীতি যেমন বহুমুখী হবে, তেমনি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে দেশটির অবস্থান আরও সুসংহত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

4 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Reuters

  • Wikipedia

  • Government of Canada

  • MCC RESPONDS: Canada–China Trade Developments and What It Means for Manitoba's Economy

  • CTV News

  • Prime Minister of Canada

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।