৭ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, তার দেশ বর্তমানে একটি "যুদ্ধাবস্থায়" রয়েছে, তবে তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন যে আমিরাত কোনো "সহজ শিকার" নয়। এই ঘোষণাটি মূলত ইরানের পক্ষ থেকে চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান সমর্থিত লক্ষ্যবস্তুগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরু হওয়ার পর থেকেই এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৫টি সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে এবং একটি সমুদ্রে পতিত হয়েছে। একই সময়ে ১২১টি ড্রোনের মধ্যে ১১৯টি ধ্বংস করা হয়েছে এবং মাত্র ২টি মাটিতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। সংঘাতের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমিরাতি বাহিনী ২২১টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ২০৫টি এবং ১৩০৫টি ড্রোনের মধ্যে ১২২৯টি সফলভাবে প্রতিহত করেছে। তবে সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস করা হলেও, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের কারণে ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলের কাছে অগ্নিকাণ্ড এবং বুর্জ আল আরবের নিকটবর্তী এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ৫ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় ৩ জন নিহত এবং ১১২ জন আহত হয়েছেন।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ইরান জর্ডান, সৌদি আরব, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এমনকি হরমুজ প্রণালীতে 'প্রিমা' নামক একটি ট্যাঙ্কারেও আক্রমণ করা হয়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। ২০২৬ সালের ৬ ও ৭ মার্চের মধ্যবর্তী রাতে ইসরায়েলি কমান্ডোরা ১৯৮৬ সালে নিখোঁজ হওয়া বৈমানিক রন আরাদের দেহাবশেষ সন্ধানে লেবাননের বেকা উপত্যকার নাবি-শিত এলাকায় অবতরণ করে। তবে লেবানিজ সূত্রগুলো দাবি করেছে যে, ছদ্মবেশে পরিচালিত এই অভিযানটি ব্যর্থ হয়েছে। হিজবুল্লাহ বাহিনী ইসরায়েলি সেনাদের ঘিরে ফেললে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এই অভিযানে ৩ জন লেবানিজ সেনাসহ মোট ৪১ জন নিহত এবং ৪০ জন আহত হয়েছেন।
৭ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ অব্যাহত রাখে, যার মধ্যে তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফ্লোরিডার মিয়ামিতে 'শিল্ড অফ আমেরিকা' সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের "নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের" দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই দিনে একটি টেলিভিশন ভাষণে পেজেশকিয়ান উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড থেকে ইরানের ওপর কোনো হামলা না চালানো হয়, তবে ইরানও তাদের ওপর কোনো আক্রমণ করবে না।
এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'ফরেন পলিসি'র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধে অত্যাধুনিক গোলাবারুদের ব্যাপক ব্যবহার মার্কিন সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষতিগ্রস্ত এএন/এফপিএস-১৩২ (AN/FPS-132) রাডার ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করতে প্রায় ৮ বছর সময় এবং ১.১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন এই হামলাগুলোকে "বর্বর ইরানি শাসন" নির্মূলের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি ঘোষণা করেছেন এবং ওয়াশিংটনের সাথে যেকোনো ধরনের আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।



