মঙ্গলে জৈব পদার্থের উৎস নিয়ে নতুন বিতর্ক: অজৈব ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে সাম্প্রতিক গবেষণা

সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.

NASA-এর Curiosity rover

৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে 'অ্যাস্ট্রোবায়োলজি' (Astrobiology) নামক বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নতুন বিশ্লেষণ মঙ্গলে জটিল জৈব অণুর উপস্থিতির কারণ হিসেবে শুধুমাত্র অজৈব বা অ্যাবায়োটিক প্রক্রিয়াকে দায়ী করার প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই গবেষণাটি মূলত নাসা (NASA)-র কিউরিওসিটি রোভারের সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গলের 'গেল ক্রেটার' (Gale Crater) নামক একটি বিশেষ অঞ্চলে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোটি কোটি বছর আগে এই অঞ্চলে একটি সমৃদ্ধ জলজ পরিবেশ বিদ্যমান ছিল।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো পাওয়া গেছে 'ইয়েলোনাইফ বে' (Yellowknife Bay) এলাকা থেকে সংগৃহীত 'কাম্বারল্যান্ড' (Cumberland) নামক একটি প্রাচীন কাদা পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এই নির্দিষ্ট নমুনায় ডেকেন, আনডেকেন এবং ডোডেকেন নামক হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির কথা প্রকাশ করেছিলেন। এই উপাদানগুলো পৃথিবীতে জীবিত কোষের পর্দার অন্যতম প্রধান উপাদান ফ্যাটি অ্যাসিডের অংশ হতে পারে বলে মনে করা হয়। মঙ্গলে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত এই বৃহত্তম জৈব অণুগুলোর ঘনত্বের প্রাথমিক পরিমাপ ছিল প্রতি ১০০ কোটিতে ৩০ থেকে ৫০ ভাগ (30–50 parts per billion)।

উল্কাপাত বা মহাজাগতিক ধূলিকণার মতো অজৈব উৎসগুলোর ভূমিকা যাচাই করার জন্য নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার পাভলভের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল কাজ করেছেন। তারা একটি বিশেষ মডেলিংয়ের মাধ্যমে মহাজাগতিক বিকিরণের প্রভাবে এই জৈব যৌগগুলো সময়ের সাথে কীভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় তা পরীক্ষা করেন। মঙ্গলের কোনো ঘন বায়ুমণ্ডল বা শক্তিশালী বিশ্বজনীন চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকায় গ্রহটি প্রতিনিয়ত তীব্র বিকিরণের শিকার হয়। বিজ্ঞানীরা নমুনাটি মঙ্গলের পৃষ্ঠতলে উন্মুক্ত হওয়ার আনুমানিক সময়কাল অর্থাৎ প্রায় ৮ কোটি বছর আগের অবস্থায় ফিরে গিয়ে এর আদি উপাদানের পরিমাণ মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন।

সিমুলেশনের ফলাফল থেকে দেখা গেছে যে, বিকিরণের প্রভাবে ধ্বংস হওয়ার আগে 'কাম্বারল্যান্ড' কাদা পাথরে দীর্ঘ-শৃঙ্খল অ্যালকেন বা তাদের পূর্বসূরী উপাদানের ঘনত্ব প্রতি ১০ লক্ষে ১২০ থেকে ৭,৭০০ ভাগ (120–7700 parts per million) পর্যন্ত হতে পারত। এই পুনর্গঠিত ঘনত্বের পরিমাণ মহাকাশ থেকে আসা উল্কা বা হাইড্রোথার্মাল বিক্রিয়ার মতো পরিচিত অজৈব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাপ্ত পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া সংগৃহীত নমুনার খনিজ গঠন এমন কোনো উচ্চ তাপমাত্রার ইঙ্গিত দেয় না যা এই ধরণের অজৈব প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল। ফলে গবেষক দলটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এই অণুগুলোর উপস্থিতি শুধুমাত্র অজৈব উৎস দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

কিউরিওসিটি রোভারের 'স্যাম্পল অ্যানালাইসিস অ্যাট মার্স' (SAM) যন্ত্রের তথ্য ব্যবহার করে করা এই গবেষণাটি প্রাচীন মঙ্গলে জটিল জৈব রসায়নের উপস্থিতির স্বপক্ষে যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। যদিও গবেষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে এটি প্রাণের অস্তিত্বের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, তবে তারা প্রাচীন অণুজীব থেকে এর উৎপত্তি হওয়ার সম্ভাবনাকে একটি 'যৌক্তিক অনুমান' হিসেবে অভিহিত করেছেন। কোটি কোটি বছর আগে জলজ পরিবেশে গঠিত পাথরে এই ধরণের বৃহৎ জৈব যৌগের উপস্থিতি গেল ক্রেটার অঞ্চলের প্রাচীন বাসযোগ্যতার বিষয়টিকে পুনরায় সমর্থন করে, যা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Focus

  • SciTechDaily

  • CPG

  • NASA's Goddard Space Flight Center

  • Click Oil and Gas

  • EarthSky

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।