আকাশ-বিজ্ঞানীরা একটি 'ইনসাইড-আউট' সৌর-ব্যবস্থা আবিষ্কার করেছে (LHS 1903), যেখানে পাথুরে গ্রহগুলো বাইরে এবং গ্যাসীয় দৈত্যগুলো ভিতরে রয়েছে।
LHS 1903 সিস্টেম: জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন একটি অনন্য 'উল্টানো' গ্রহমণ্ডল
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর থমাস উইলসনের নেতৃত্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে LHS 1903 নামক একটি গ্রহমণ্ডলীর অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। 'সায়েন্স' (Science) নামক বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলগুলোতে পৃথিবী থেকে প্রায় ১১৬-১১৭ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি অনুজ্জ্বল লাল বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত চারটি গ্রহের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার গঠনশৈলী অত্যন্ত চমকপ্রদ—নক্ষত্র থেকে দূরত্বের ক্রমানুসারে এখানে গ্রহগুলো যথাক্রমে পাথুরে-গ্যাসীয়-গ্যাসীয়-পাথুরে বিন্যাসে সাজানো। এই স্থাপত্যটি আমাদের নিজস্ব সৌরজগতসহ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে সচরাচর দেখা যাওয়া মডেলগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং মহাকাশ বিজ্ঞানে এক বিশাল বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
২০১৯ সালে নাসার (NASA) টেস (TESS) মিশনের মাধ্যমে এই সিস্টেম সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-র কিওপস (CHEOPS) স্যাটেলাইটের সাহায্যে এর আরও গভীর ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হয়। LHS 1903 নক্ষত্রটি একটি এম-বামন (M-dwarf) শ্রেণীর নক্ষত্র, যা মহাবিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ ধরণের নক্ষত্র হলেও এর গ্রহমণ্ডলটি অভাবনীয় কিছু বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করছে। এর প্রধান অসঙ্গতিটি লক্ষ্য করা গেছে চতুর্থ গ্রহ LHS 1903 e-এর ক্ষেত্রে। সাধারণত গ্যাসীয় দানব গ্রহগুলোর বাইরে পাথুরে গ্রহ দেখা যায় না, কিন্তু এই গ্রহটি তার দূরবর্তী অবস্থান সত্ত্বেও একটি পাথুরে গঠন বজায় রেখেছে। এটি প্রচলিত বৈজ্ঞানিক ধারণার পরিপন্থী, যেখানে মনে করা হয় যে কঠিন গ্রহগুলো কেবল নক্ষত্রের কাছেই তৈরি হয় এবং গ্যাসীয় দানবগুলো 'তুষার রেখা' বা 'স্নো লাইন'-এর ওপারে গঠিত হয় যেখানে প্রচুর পরিমাণে বরফ ও গ্যাস ঘনীভূত থাকে।
গবেষকদের গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, LHS 1903 e গ্রহটির ব্যাসার্ধ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ১.৭ গুণ এবং ভর পৃথিবীর ভরের প্রায় ৫.৭৯ গুণ, যা একে একটি 'সুপার-আর্থ' (Super-Earth) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করে। এই উল্টানো কাঠামোর ব্যাখ্যা হিসেবে বিজ্ঞানীরা গ্রহের স্থানান্তর বা কোনো প্রলয়ঙ্কারী সংঘর্ষের তত্ত্বকে নাকচ করে দিয়েছেন। পরিবর্তে, ডক্টর উইলসনের দল 'ইনসাইড-আউট' বা 'ভিতর থেকে বাইরে' নামক একটি ধারাবাহিক গঠন তত্ত্ব প্রস্তাব করেছেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, গ্রহগুলো মহাজাগতিক সময়ের ব্যবধানে একের পর এক ক্রমানুসারে গঠিত হয়েছে। ডক্টর উইলসনের মতে, এই আবিষ্কারটি সম্ভবত গ্যাস-শূন্য পরিবেশে গ্রহ গঠনের প্রথম অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণ প্রদান করে, যা একটি অ-সিঙ্ক্রোনাস বা অসমকালীন প্রক্রিয়ার দিকে জোরালো ইঙ্গিত দেয়।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ডক্টর ইসাবেল রেবোলিডো জোর দিয়ে বলেছেন যে, LHS 1903-এর মতো বৈচিত্র্যময় সিস্টেমের আবিষ্কার বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে তাদের প্রচলিত তত্ত্বগুলো পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে, যা ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সৌরজগতের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। ইএসএ-র কিওপস প্রকল্পের বিজ্ঞানী ম্যাক্সিমিলিয়ান গুন্থার এই রহস্য সমাধানে বিশেষ সন্তোষ প্রকাশ করে জানান যে, এই ধরণের জটিল মহাজাগতিক ধাঁধার সমাধান করাই তাদের মিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ভবিষ্যতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) ব্যবহার করে LHS 1903 e-এর বায়ুমণ্ডলীয় গঠন এবং পৃষ্ঠের অবস্থা পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। LHS 1903-এর এই অনন্য স্থাপত্যটি গ্রহীয় সঞ্চয়ন বা অ্যাক্রিশন মডেলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা প্রাথমিক উপাদানের বণ্টনের চেয়ে গঠন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করে।
উৎসসমূহ
Ecoavant
CNN.gr
EurekAlert!
McMaster University
BIOENGINEER.ORG
University of Warwick
Press Release
SSBCrack News
ESA
Science News
University of Warwick
McMaster University
