মহাজাগতিক আগন্তুক: ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু ৩আই/অ্যাটলাস পর্যবেক্ষণের মূল মুহূর্তসমূহ
লেখক: gaya ❤️ one
মানব ইতিহাসের তৃতীয় আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু ৩আই/অ্যাটলাস (3I/ATLAS) ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে এক বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আবিষ্কৃত এই ধূমকেতুটি সি/২০২৫ এন১ (অ্যাটলাস) নামেও পরিচিত, যা ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সূর্যের সবচেয়ে কাছে বা পেরিহেলিয়ন বিন্দু অতিক্রম করে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং অভাবনীয় সক্রিয়তা প্রদর্শন করতে শুরু করে। নাসা (NASA), সেটি ইনস্টিটিউট (SETI Institute) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করব।
জানুয়ারির প্রথম দিনগুলোতে ধূমকেতুটি তার উজ্জ্বলতা ও সক্রিয়তা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখে, যা সাধারণ ধূমকেতুর আচরণের গাণিতিক মডেলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। নাসার আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, পেরিহেলিয়ন অতিক্রমের পর এটি থেকে হঠাৎ করেই প্রচুর পরিমাণে গ্যাস ও ধূলিকণা নির্গত হতে শুরু করে। সাই.নিউজ (Sci.News) এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ধূমকেতুটি এই সময়ে "সম্পূর্ণরূপে জেগে ওঠে" এবং এর ভেতরের বরফ বাষ্পীভূত হওয়ার ফলে এর আচরণে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। এটি পেরিহেলিয়নের আগের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
৬ থেকে ১৪ জানুয়ারির মধ্যে নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (Hubble Space Telescope) ধূমকেতুটির জেটের জটিল গঠন এবং উজ্জ্বলতার বিশদ মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়। ১৪ জানুয়ারি হাবল মোট ছয়টি ছবি তোলে, যেখানে দেখা যায় তিনটি ক্ষুদ্র জেট প্রায় ১২০ ডিগ্রি কোণে বিন্যস্ত হয়ে একটি নিখুঁত সমবাহু ত্রিভুজের মতো জ্যামিতিক আকৃতি তৈরি করেছে। এই অদ্ভুত গঠন বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। জ্যোতির্পদার্থবিদ আভি লোয়েব (Avi Loeb) তার এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের প্রতিসাম্য কোনো কৃত্রিম প্রযুক্তিগত সংকেত হতে পারে। একই দিনে ইউরোপা ক্লিপার (Europa Clipper) মিশনের আল্ট্রাভায়োলেট স্পেকট্রোমিটার ধূমকেতুটির অতিবেগুনি বর্ণালীর বিরল তথ্য সংগ্রহ করে।
১৫ জানুয়ারি থেকে নাসার টেস (TESS) স্যাটেলাইট ধূমকেতুটিকে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ক্রান্তিবৃত্ত বরাবর ধূমকেতুটির গতিবিধি অনুসরণ করা। ১৭৫১ নম্বর সেক্টরের এই পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে। ১৬ জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয় যে, ধূমকেতুটির গতিশীলতা এবং এর পরিবর্তনের ধরণ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সফল তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
২২ জানুয়ারি ছিল এই মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং নাটকীয় দিন, যখন ধূমকেতু, পৃথিবী এবং সূর্য মহাকাশে প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করছিল। এই বিরল সংযোগের ফলে ধূমকেতুটি তার সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতায় পৌঁছায়, যা পর্যবেক্ষকদের জন্য অনেকটা "পূর্ণিমার চাঁদের" মতো উজ্জ্বলতা তৈরি করেছিল। উইয়ন (WION) এবং উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, এই বিশেষ জ্যামিতিক অবস্থানের কারণে ধূমকেতুটি সারা রাত আকাশজুড়ে দৃশ্যমান ছিল এবং এটি ছিল পর্যবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
এই বিশেষ দিনে ভার্চুয়াল টেলিস্কোপ প্রজেক্ট একটি সরাসরি অনলাইন সম্প্রচারের আয়োজন করে, যার মাধ্যমে বিশ্বের হাজার হাজার মহাকাশ প্রেমী ধূমকেতুটিকে রিয়েল-টাইমে দেখার সুযোগ পায়। পর্যবেক্ষণে এর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি এবং একটি বিপরীত লেজ বা অ্যান্টি-টেইল (anti-tail) এর অস্তিত্ব ধরা পড়ে। যদিও হাবল টেলিস্কোপ ১৪ জানুয়ারি প্রধান ছবিগুলো সংগ্রহ করেছিল, তবে ভিএলটি (VLT) এবং জেমিনি (Gemini) এর মতো ভূমি-ভিত্তিক শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলোও এই সক্রিয়তা নিশ্চিত করেছে। আইএডব্লিউএন (IAWN) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেস-এর পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
এই গবেষণার তথ্যগুলো অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং বৈজ্ঞানিক সূত্র থেকে সংগৃহীত হয়েছে। হাবল টেলিস্কোপ জেটের উচ্চমানের ছবি সরবরাহ করেছে, টেস এর গতিপথের গতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করেছে এবং ইউরোপা ক্লিপার এর অতিবেগুনি বর্ণালী বিশ্লেষণ করেছে। যদিও স্পেয়ারএক্স (SPHEREx) মিশন থেকে সাম্প্রতিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে সামগ্রিক প্রতিবেদনগুলো নিশ্চিত করে যে পেরিহেলিয়ন পরবর্তী সময়ে ধূমকেতুটি অভূতপূর্বভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল এবং এটি বিজ্ঞানীদের জন্য এক নতুন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
৩আই/অ্যাটলাস ধূমকেতুর কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে এর কৃত্রিম উৎস সম্পর্কে গভীর জল্পনা তৈরি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এর জেটের জ্যামিতিক বিন্যাস। সাধারণ ধূমকেতুর জেটগুলো সাধারণত সূর্যের তাপে বরফ গলে এলোমেলোভাবে নির্গত হয়। কিন্তু এই ধূমকেতুর তিনটি জেট প্রায় নিখুঁত ১২০ ডিগ্রি কোণে অবস্থান করছিল, যা একটি সমবাহু ত্রিভুজের মতো দেখায়। আভি লোয়েব মনে করেন, এই ধরনের সুশৃঙ্খল প্রতিসাম্য প্রাকৃতিক পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মের পরিপন্থী এবং এটি কোনো উন্নত প্রকৌশল ব্যবস্থার ইঙ্গিত হতে পারে।
ধূমকেতুটি এক অস্বাভাবিক ত্বরণ প্রদর্শন করেছে যা কেবল সাধারণ গ্যাস নির্গমনের রকেট প্রভাবের মাধ্যমে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর গতিপথের মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম বিচ্যুতি লক্ষ্য করা গেছে। আভি লোয়েবের মতে, এটি হয়তো বৃহস্পতি গ্রহের আশেপাশে তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনো ক্ষুদ্র অনুসন্ধানকারী যান পাঠানোর কারণে ঘটতে পারে। এই ধরনের কৌশলগত চালচলন কোনো প্রাকৃতিক মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা যায় না। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে যে ৩আই/অ্যাটলাস হয়তো একটি "মাদারশিপ" বা মাতৃযান হতে পারে যা থেকে ছোট ছোট ড্রোন বা স্যাটেলাইট নির্গত হচ্ছে।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে এই ধূমকেতুতে নিকেলের পরিমাণ এবং অন্যান্য উপাদানের প্রাচুর্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এই উপাদানগুলো সাধারণত অন্যান্য আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। লোয়েব ধারণা করেছেন যে, এটি কোনো প্রযুক্তিগত যন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বা অংশ হতে পারে। এছাড়া এর বিপরীত লেজ বা অ্যান্টি-টেইল (anti-tail) এর গঠনও ছিল অত্যন্ত রহস্যময়। এই সমস্ত অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যগুলো ৩আই/অ্যাটলাসকে কোনো প্রাচীন ভিনগ্রহী সভ্যতার "বায়োমেকানিক্যাল আর্ক" বা জৈব-যান্ত্রিক তরী হিসেবে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ৩আই/অ্যাটলাস কেবল একটি সাধারণ ধূমকেতু নয়, বরং এটি আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের এক বিশাল রহস্য। এর জ্যামিতিক গঠন, অস্বাভাবিক গতি এবং রাসায়নিক উপাদানের বৈচিত্র্য বিজ্ঞানীদের নতুন করে মহাকাশ গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করছে। জানুয়ারি ২০২৬-এর এই পর্যবেক্ষণগুলো ভবিষ্যতে আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু এবং আমাদের সৌরজগতের বাইরের জগত সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে আমূল বদলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং হাবল ও টেস-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে আমরা এই মহাজাগতিক আগন্তুক সম্পর্কে এত বিস্তারিত তথ্য জানতে পেরেছি। যদিও এর কৃত্রিমতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি নিশ্চিত যে ৩আই/অ্যাটলাস আমাদের মহাবিশ্বের বিশালতা এবং এর অজানা রহস্যগুলো সম্পর্কে আরও কৌতূহলী করে তুলেছে। এই পর্যবেক্ষণগুলো আগামী দিনের মহাকাশ গবেষণায় এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
25 দৃশ্য
উৎসসমূহ
spectroscopyonline
AstroWright
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
