২০২৬ সালের ১১ মার্চ, বুধবার সন্ধ্যায় জার্মানির রাজধানী বার্লিনের প্রধান আকাশপথের প্রবেশদ্বার বার্লিন-ব্র্যান্ডেনবার্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (BER) এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিমানবন্দরের রাডারে এবং চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণে একটি অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু বা আনআইডেন্টিফাইড এরিয়াল অবজেক্ট শনাক্ত হওয়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে সমস্ত উড্ডয়ন ও অবতরণ কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭:০০টা থেকে শুরু হওয়া এই জরুরি পদক্ষেপটি প্রায় আধা ঘণ্টা স্থায়ী ছিল, যা বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাময়িক স্থবিরতা সৃষ্টি করে। নিরাপত্তার এই আগাম সতর্কতা মূলত সম্ভাব্য কোনো দুর্ঘটনা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এড়ানোর লক্ষ্যেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হয়েছিল।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে যে, জার্মান সশস্ত্র বাহিনীর (বুন্দেসওয়েহর) হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গারের ঠিক পাশেই ওই রহস্যময় বস্তুটি ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিল। এই অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকায় অজ্ঞাত বস্তুর উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে সাথেই জার্মান ফেডারেল পুলিশকে তদন্তের জন্য তলব করা হয়। তবে পুলিশি তল্লাশি চলাকালীন বস্তুটি আর দ্বিতীয়বার দৃশ্যমান হয়নি এবং এর সঠিক উৎস বা পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে পরিস্থিতি নিরাপদ বিবেচনা করে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭:১০ মিনিটে (১৮:১০ জিএমটি) উড্ডয়ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। যদিও বিমান চলাচল দ্রুত পুনরায় শুরু হয়, তবে এই সাময়িক বিঘ্নের ফলে পরবর্তী বেশ কিছু ফ্লাইটের সময়সূচিতে কিছুটা বিলম্ব লক্ষ্য করা গেছে এবং যাত্রীদের সাময়িক ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি ইউরোপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর দিয়ে অননুমোদিত ড্রোন বা অজ্ঞাত যানের উড্ডয়নের একটি দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগকে আবারও সামনে এনেছে। জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ, যিনি ২০২৫ সালের মে মাসে চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন, এর আগেও এই ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, জার্মানি এবং ইউরোপের অন্যান্য সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বেশিরভাগ সন্দেহভাজন ড্রোনের পেছনে মস্কোর মদত থাকতে পারে। তবে ক্রেমলিন শুরু থেকেই এই ধরনের সমস্ত অভিযোগকে ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়ে আসছে, যা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ড্রোনের মাধ্যমে সৃষ্ট এই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় জার্মানি ইতিমধ্যেই কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি বিশেষ আইন অনুমোদন করা হয়, যা পুলিশ বাহিনীকে "তীব্র হুমকি বা গুরুতর ক্ষতির" আশঙ্কা থাকলে সন্দেহভাজন ড্রোনগুলোকে সরাসরি গুলি করে ভূপাতিত করার আইনি ক্ষমতা প্রদান করে। ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ অফিস (BKA)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সমস্যার গভীরতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এটি একটি পদ্ধতিগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন ড্রোন উড্ডয়নের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই ঘটেছে সামরিক ঘাঁটি, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে। এই পরিসংখ্যানটি আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি, যা আকাশসীমা সুরক্ষার চ্যালেঞ্জকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বার্লিন-ব্র্যান্ডেনবার্গ বিমানবন্দরে এই ধরনের বিভ্রাট এবারই প্রথম নয়; এর আগেও ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর প্রায় দুই ঘণ্টা এবং ১ নভেম্বর একই ধরনের নিরাপত্তা জনিত কারণে বিমানবন্দর বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সেই সময় অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইটকে বিকল্প বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে চ্যান্সেলর মার্জ ইউরোপের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা এবং আকাশসীমা সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। ১১ মার্চের এই আধা ঘণ্টার ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে, ২০২৬ সালেও জার্মানির আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বহিঃশত্রুর ড্রোন তৎপরতা বন্ধ করা জার্মান প্রশাসনের জন্য একটি শীর্ষ অগ্রাধিকারমূলক কাজ হিসেবে রয়ে গেছে।


