রঙ ছাড়াই সোনালী আভা: সমুদ্রের গভীর থেকে ফিরে এলো কিংবদন্তি 'সি সিল্ক'

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

সমুদ্র থেকে সিল্ক বোনা

দক্ষিণ কোরিয়ার পোহাং ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (POSTECH)-এর একটি গবেষক দল প্রাচীন রোমের সময় থেকে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে পরিচিত কিংবদন্তি 'সি সিল্ক' বা সামুদ্রিক রেশম পুনর্নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিশেষ ধরনের কাপড়টি তার অবিশ্বাস্য হালকা ওজন, স্থায়িত্ব এবং প্রাকৃতিক সোনালী উজ্জ্বলতার জন্য ঐতিহাসিকভাবে সমাদৃত ছিল। অতীতে এই তন্তুগুলো ভূমধ্যসাগরীয় মলাস্ক বা ঝিনুক Pinna nobilis-এর বিসাস থ্রেড থেকে তৈরি করা হতো, তবে বর্তমানে এই প্রজাতিটি কঠোর সুরক্ষার অধীনে থাকায় এর ঐতিহ্যগত উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

প্রফেসর ডং সু হোয়াং এবং প্রফেসর জিমিন চোই-এর নেতৃত্বে গবেষক দলটি একটি টেকসই বিকল্প খুঁজে বের করেছেন। তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যাপকভাবে চাষ করা Atrina pectinata নামক ঝিনুকের বিসাস থ্রেড ব্যবহার করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আগে এই তন্তুগুলোকে খাদ্য শিল্পের একটি উপজাত বা বর্জ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এগুলো প্রক্রিয়াজাত করার একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই তন্তুগুলোর ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ঐতিহাসিক সামুদ্রিক রেশমের সাথে হুবহু মিলে যায়। এই যুগান্তকারী গবেষণাটি ২০২৫ সালে Advanced Materials সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় এবং ২০২৬ সালের মধ্যে এটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক দিক হলো সামুদ্রিক রেশমের 'চিরস্থায়ী সোনালী' রঙের রহস্য উন্মোচন করা। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই সোনালী আভা কোনো কৃত্রিম রঞ্জক বা ডাই থেকে আসে না, বরং এটি একটি 'গাঠনিক বর্ণ' বা স্ট্রাকচারাল কালারেশন। তন্তুগুলোর ভেতরে 'ফটোনিন' (photonin) নামক ন্যানো-আকারের প্রোটিন গোলক পাওয়া গেছে, যা সুশৃঙ্খল স্তর তৈরি করে এবং আলোর সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে রঙ তৈরি করে। ফলে এই সোনালী রঙ উপাদানের কাঠামোরই একটি অংশ এবং সাধারণ পিগমেন্টের মতো এটি সময়ের সাথে ম্লান হয় না।

এই আবিষ্কারের ব্যবহারিক গুরুত্ব কেবল ঐতিহাসিক পুনর্গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি রঞ্জকহীন দীর্ঘস্থায়ী টেক্সটাইল তৈরির একটি নতুন মডেল হিসেবে কাজ করবে, যেখানে রঙ সরাসরি প্রাকৃতিক ন্যানোস্ট্রাকচার থেকে উদ্ভূত হয়। এটি পরিবেশবান্ধব এবং আধুনিক ফ্যাশন ও মেটেরিয়াল ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও টেকসই সমাধান হতে পারে। রাসায়নিক রঙের ব্যবহার হ্রাস করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই ঘটনাটি আমাদের গ্রহের প্রাকৃতিক সুরের সাথে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একে সমুদ্রের একটি 'শান্ত সোনালী সুর' হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে—এমন এক পদার্থের শব্দ যা কোনো সহিংসতা বা কৃত্রিম রঙ ছাড়াই উজ্জ্বল হতে শেখে। আমরা দেখতে পাচ্ছি কীভাবে সমুদ্র আলোর বুনন তৈরি করতে পারে; এটি কাপড়ের উপরে কোনো প্রলেপ নয়, বরং কাঠামোর ভেতরেই রঙের অস্তিত্ব মিশে থাকে, যেখানে রঙ কেবল একটি আবরণ নয় বরং একটি স্মৃতিতে পরিণত হয়।

পরিশেষে, এটি একটি নতুন নৈতিকতার সংকেত বহন করে। এখানে বর্জ্য বা উপজাত বস্তুকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা হয়েছে, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলো রক্ষার সুযোগ পেয়েছে এবং প্রযুক্তি প্রকৃতির প্রজ্ঞাকে ধ্বংস না করে বরং তাকে অনুসরণ করতে শিখেছে। এই উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যখন প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলে, তখন তা মানবসভ্যতাকে আরও সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে তোলে।

9 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • ScienceDaily

  • ScienceDaily

  • SciTechDaily

  • ResearchGate

  • ResearchGate

  • SPA/RAC

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।