বিশ্বের সবচেয়ে বিরল সামুদ্রিক কচ্ছপের জন্য একটি শ্রবণ পরীক্ষা
বিপন্ন কেম্পস রিডলি কচ্ছপের শ্রবণ ক্ষমতা: সমুদ্রের শব্দদূষণ কি তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি?
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
JASA (Journal of the Acoustical Society of America)-তে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণা সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরল দিক উন্মোচন করেছে। বিশ্বের অন্যতম বিপন্ন সামুদ্রিক কচ্ছপ হিসেবে পরিচিত কেম্পস রিডলি (Kemp's ridley) কচ্ছপ সমুদ্রের শব্দজগতকে ঠিক কীভাবে অনুভব করে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন এক স্বচ্ছ ও গাণিতিক ধারণা প্রদান করেছেন। গবেষকরা এই কচ্ছপগুলোর শ্রবণ সংবেদনশীলতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিমাপ করার জন্য উন্নত এবং অ-আক্রমণাত্মক অডিটরি ইভোকড পটেনশিয়াল (AEP) সেন্সর ব্যবহার করেছেন। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, তরুণ কেম্পস রিডলি কচ্ছপগুলো মূলত ২০০ থেকে ৩০০ হার্টজ (Hz) এর মতো নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দের প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে। তবে তাদের শ্রবণেন্দ্রিয়ের প্রতিক্রিয়া প্রায় ৮০০ হার্টজ পর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে এক নতুন তথ্য।
এই গবেষণার ফলাফল একটি অত্যন্ত জটিল এবং সমালোচনামূলক বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। সমুদ্রের যে নির্দিষ্ট নিম্ন কম্পাঙ্কের পরিসরে এই কচ্ছপগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং সংবেদনশীল, ঠিক সেই একই পরিসরে আধুনিক জাহাজ চলাচল এবং উপকূলীয় শিল্পকারখানার যান্ত্রিক শব্দও সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার করে। এই ধরনের "লং-রেঞ্জ" বা দূরপাল্লার শব্দগুলো সমুদ্রের তলদেশে মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া পরিবেশগত সংকেতগুলোকে ঢেকে দিতে পারে। গবেষকরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই গবেষণাটি সরাসরি কোনো শারীরিক ক্ষতির প্রমাণ এখনই দিচ্ছে না। তবে এটি স্পষ্টভাবে সেই নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক সীমা বা ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জ নির্ধারণ করে দিয়েছে যা সামুদ্রিক কার্যক্রম এবং উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
পৃথিবীর এই বিশাল জলরাশির শব্দতরঙ্গে নতুন এই বৈজ্ঞানিক তথ্য এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। আমরা যেন প্রথমবারের মতো এই বিরল প্রজাতির একটি "অভ্যন্তরীণ শ্রবণ ক্ষমতা" বা ইননার হিয়ারিংয়ের কথা জানতে পারলাম। এর মাধ্যমে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, আমাদের আধুনিক সভ্যতার যান্ত্রিক কোলাহল কেবল সমুদ্রের পানিতে মিশছে না, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির প্রাকৃতিক নেভিগেশন বা দিকনির্ণয় ব্যবস্থায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। যখন সমুদ্রের তলদেশ মানুষের তৈরি শব্দের কারণে ক্রমাগত উচ্চকিত হতে থাকে, তখন এই প্রাণীরা তাদের শিকার ধরা, শত্রু থেকে বাঁচা বা সঠিক গন্তব্য খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সংকেতগুলো হারিয়ে ফেলতে পারে।
কেম্পস রিডলি কচ্ছপের এই শ্রবণ ক্ষমতা নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এই প্রজাতিটি বর্তমানে বিলুপ্তির চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এই কচ্ছপগুলো তাদের জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে সমুদ্রের অগভীর উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকে। মানুষের তৈরি যান্ত্রিক শব্দ যদি তাদের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া বা খাদ্য সন্ধানের পথে বাধার সৃষ্টি করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে এই প্রজাতির টিকে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলবে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো ভবিষ্যতে সামুদ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন, সেখানে এই তথ্যগুলো দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, সমুদ্রের তথাকথিত নীরবতা এখন কেবল একটি প্রাচীন ধারণা মাত্র। বিশালকার জাহাজের প্রপেলার থেকে শুরু করে উপকূলীয় অঞ্চলের নির্মাণ কাজ—সবই সমুদ্রের তলদেশের শান্ত পরিবেশকে প্রতিনিয়ত বিঘ্নিত করছে। কেম্পস রিডলি কচ্ছপের ওপর করা এই গবেষণাটি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে যে, প্রতিটি সামুদ্রিক প্রাণের নিজস্ব একটি ভাষা এবং শোনার জগত রয়েছে। আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় যেন সেই সূক্ষ্ম শ্রবণ ক্ষমতা এবং তাদের বেঁচে থাকার পরিবেশ চিরতরে হারিয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সমুদ্রের এই বিপন্ন বাসিন্দাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের আরও বেশি শব্দ-সচেতন হতে হবে এবং সমুদ্রের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
উৎসসমূহ
ScienceDaily
National Today
Sea Turtle Conservancy
EurekAlert!
NOAA Institutional Repository
ScienceDaily