মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষণায় নতুন মোড়: চাঞ্চল্যকর তথ্যের নেপথ্যে বৈজ্ঞানিক সতর্কতা

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

ক্যাপশন: Pyrolysis-GC/MS সিস্টেম ব্যবহার করে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিশ্লেষণ

২০২৪ সালের শেষ এবং ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বৈজ্ঞানিক মহলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক শুরু হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্ক এবং ধমনীর মতো সংবেদনশীল টিস্যুতে মাইক্রো এবং ন্যানোপ্লাস্টিক (MNP) পাওয়ার দাবি নিয়ে এই আলোচনার সূত্রপাত। গণমাধ্যমে এই খবরগুলো ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলেও, বর্তমানে গবেষকরা এই তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন।

এই বিতর্কের মূল নির্যাস এটি নয় যে প্লাস্টিকের অস্তিত্ব নেই, বরং মূল প্রশ্নটি হলো জৈবিক নমুনায় এর পরিমাণ নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে। পরিবেশে প্লাস্টিকের উপস্থিতি আজ একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। তবে মানুষের শরীরের টিস্যুতে এই তথ্যের প্রয়োগ করতে হলে এমন এক বিশ্লেষণাত্মক সূক্ষ্মতা প্রয়োজন, যা সাম্প্রতিক কিছু আলোচিত গবেষণায় হয়তো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে পাইরোলাইটিক গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি-মাস স্পেকট্রোমেট্রি (Py-GC-MS) নামক একটি বিশেষ পদ্ধতি। বিশেষ করে মস্তিষ্কের টিস্যুর মতো চর্বিযুক্ত বা লিপিড-সমৃদ্ধ নমুনার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন গভীর সংশয় প্রকাশ করছেন।

জার্মানির হেলমহোল্টজ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের গবেষক দুশান মাতেরিচ (Dušan Materić) এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, চর্বি বা লিপিড বিশ্লেষণের সময় Py-GC-MS পদ্ধতি ভুল সংকেত বা ফলস পজিটিভ ফলাফল দেওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা থাকে।

এর প্রধান কারণ হলো, পলিইথিলিন এবং পলিভিনাইল ক্লোরাইডের বিয়োজন থেকে উৎপন্ন রাসায়নিক পদার্থগুলো মানুষের শরীরের লিপিড ভেঙে তৈরি হওয়া যৌগের সাথে আংশিকভাবে মিলে যায়। এমনকি নমুনার রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণের পরেও এই সংকেতগুলোর পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা গবেষণার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (QAEHS) গবেষক ক্যাসান্ড্রা রাউয়ার্ট (Cassandra Rauert) একটি স্বাধীন বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই আশঙ্কার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তার গবেষণায় দেখা গেছে যে, বর্তমান অবস্থায় চর্বিযুক্ত মাধ্যমে পলিইথিলিন শনাক্ত করার জন্য Py-GC-MS পদ্ধতিটি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।

রাউয়ার্টের মতে, সংকেতের এই বিভ্রান্তি বা ইন্টারফারেন্স সঠিক ফলাফল পাওয়ার পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন যে, বর্তমান প্রযুক্তিতে চর্বিযুক্ত টিস্যুতে প্লাস্টিকের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে তা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

এর আগে রাউয়ার্টের দল চর্বিযুক্ত খাদ্যপণ্যের জন্য কিছু বিকল্প প্রোটোকল বা নিয়মাবলী তৈরি করেছিলেন। তারা প্রমাণ করেছিলেন যে, যদি নমুনার মূল উপাদান থেকে বিভ্রান্তিকর সংকেতগুলো সঠিকভাবে সরিয়ে ফেলা যায়, তবে শনাক্তকরণের সীমা অনেক উন্নত হয় এবং ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে সমস্যাটি গবেষণার বিষয়বস্তুতে নয়, বরং ব্যবহৃত যন্ত্র বা পদ্ধতিতে।

সহকর্মী গবেষকদের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত অন্তত ১৮টি গবেষণাপত্র এখন পুনরায় পর্যালোচনা বা রিভিশন করা প্রয়োজন। এই গবেষণাগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, কিন্তু এখন সেগুলোর ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রখ্যাত রসায়নবিদ রজার কুহলম্যান (Roger Keuhlman) এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে যখন কোনো অসাধারণ বা চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়, তখন তার স্বপক্ষে অসাধারণ এবং কঠোর প্রমাণের প্রয়োজন হয়। বর্তমান গবেষণার ক্ষেত্রে ঠিক এই জায়গাতেই ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তবে প্লাস্টিক দূষণের সামগ্রিক ভয়াবহতাকে কোনো বিজ্ঞানীই অস্বীকার করছেন না। শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই পাবমেড (PubMed) ডাটাবেসে মাইক্রোপ্লাস্টিক সংক্রান্ত ১২,০০০-এরও বেশি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ নিবন্ধিত হয়েছে। সুতরাং প্রশ্নটি দূষণের অস্তিত্ব নিয়ে নয়, বরং মানুষের শরীরের অভ্যন্তরে থাকা প্লাস্টিক সংক্রান্ত তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যা নিয়ে।

সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে এই আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহাসাগর হলো প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রধান আধার, আর মানুষের শরীরে প্লাস্টিকের উপস্থিতি সংক্রান্ত গবেষণাগুলো বিজ্ঞান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আবেগীয় যোগসূত্র তৈরি করেছে। যদি এই গবেষণার পদ্ধতিগুলো অপরিপক্ক হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এই ঝুঁকির মধ্যে প্রধান দুটি দিক হলো:

  • জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে অকাল বা ভুল কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া যা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে;
  • ভুল তথ্যের কারণে সামগ্রিক প্লাস্টিক দূষণ সমস্যার গুরুত্ব ও বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসযোগ্যতা সাধারণ মানুষের কাছে হ্রাস পাওয়া।

আমরা বর্তমানে বিজ্ঞানের কোনো সংকট প্রত্যক্ষ করছি না, বরং এটি বিজ্ঞানের একটি প্রয়োজনীয় পরিমার্জন বা ফাইন-টিউনিং প্রক্রিয়া। গবেষকরা এখন আরও শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য প্রোটোকল তৈরির কাজ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে লিপিডের এনজাইমেটিক ভাঙ্গন এবং সংকুচিত তরল নিষ্কাশন (compressed liquid extraction) পদ্ধতি।

এছাড়াও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (QA/QC) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরির মধ্যে ফলাফলের পারস্পরিক যাচাইকরণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে মাইক্রোপ্লাস্টিক গবেষণাকে আরও নিখুঁত এবং প্রশ্নাতীত করে তুলবে।

পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশে প্লাস্টিকের উপস্থিতি একটি রূঢ় বাস্তব এবং জৈবিক নমুনায় পলিমারের চিহ্ন থাকা অত্যন্ত সম্ভব। তবে সঠিক পরিমাণগত মূল্যায়নের জন্য যে পদ্ধতিগত পরিপক্কতা প্রয়োজন, তা এখন কেবল গড়ে উঠছে। এটি বিজ্ঞানের পিছিয়ে যাওয়া নয়, বরং এমন এক বিজ্ঞানের দিকে যাত্রা যাকে বিশ্ববাসী নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতে পারবে।

চাঞ্চল্যকর খবরের চেয়ে এখন তথ্যের সূক্ষ্মতা বেশি প্রয়োজন। সমুদ্র, গবেষণাগার এবং সমাজের মধ্যে এই বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছতা প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে। এটি আমাদের গ্রহ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে এবং বিজ্ঞানকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।

11 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Guardian

  • Vrije Universiteit Amsterdam

  • The Guardian

  • The Guardian

  • Google Scholar

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।