সমুদ্রের সজারু যখন পানির প্রবাহ 'শোনে': প্রাকৃতিক সেন্সর হিসেবে কাঁটার বিস্ময়কর ভূমিকা

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

উপকূলীয় জম্বি: পরিবর্তিত মহাসাগরে সাগর-উর্চিন — Dr. Daniel Okamoto (UC Berkeley)

সামুদ্রিক সজারু বা একিনোডিয়া (Echinoidea) শ্রেণির প্রাণীদের আমরা সাধারণত তাদের শক্ত খোলস এবং চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কাঁটার জন্য চিনি। সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী এই জীবগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হলেও, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে গবেষকরা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তারা দেখিয়েছেন যে, এই প্রাণীদের কাঁটাগুলো কেবল আত্মরক্ষার অস্ত্র নয়, বরং এগুলো পানির প্রবাহ অনুভব করতে পারে এবং সেই প্রবাহকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করতে সক্ষম।

গবেষণায় দেখা গেছে, যখন পানি এই কাঁটাগুলোর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন সেখানে আক্ষরিক অর্থেই একটি বৈদ্যুতিক বিভব বা ইলেকট্রিক্যাল পটেনশিয়াল তৈরি হয়। এই বিশেষ ক্ষমতাটি সমুদ্রের সজারুকে তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে এক অনন্য ধারণা প্রদান করে। প্রকৃতির এই বিস্ময়কর প্রকৌশল বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে, যা পানির গতিবিধিকে বিদ্যুতে রূপান্তরের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

এই প্রক্রিয়ার মূল রহস্য লুকিয়ে আছে কাঁটার অনন্য 'গ্রেডিয়েন্ট সেলুলার স্ট্রাকচার' বা স্তরীভূত কোষীয় কাঠামোর মধ্যে, যাকে বিজ্ঞানীরা 'স্টিরিওম' (stereom) বলে অভিহিত করেন। এটি মূলত একটি জটিল এবং আন্তঃসংযুক্ত জালের মতো কাঠামো, যেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র বা পোরস বিদ্যমান। এই ছিদ্রগুলোর বিশেষত্ব হলো এদের আকার কাঁটার গোড়া থেকে অগ্রভাগ পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়, যা একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক অনুপাত বা গ্রেডিয়েন্ট বজায় রাখে। এই সূক্ষ্ম প্রকৌশলটিই মূলত পানির প্রবাহকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করে।

এই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কারণে যখন পানি কাঁটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন সেই প্রবাহের গতি প্রকৃতি সব জায়গায় সমান থাকে না। কাঁটার অগ্রভাগের দিকে ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলো আরও বেশি ঘন এবং ছোট হতে থাকে, যার ফলে সেখানে পানির গতিবেগ এবং স্থানীয় চাপের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। চাপের এই তারতম্য সরাসরি বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়ার তীব্রতাকে প্রভাবিত করে—অর্থাৎ যেখানে চাপ বেশি, সেখানে বৈদ্যুতিক সংকেতও শক্তিশালী হয়। এভাবেই একটি সাধারণ জৈবিক কাঠামো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কার্যকর প্রাকৃতিক সেন্সরে রূপান্তরিত হয়।

পানির প্রবাহ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রক্রিয়াটি মূলত 'ইলেকট্রিক ডাবল লেয়ার' (EDL) বা দ্বৈত বৈদ্যুতিক স্তরের মেকানিজমের সাথে যুক্ত। যখন কোনো কঠিন পদার্থ এবং তরল পদার্থের মিলন ঘটে, তখন তাদের সংযোগস্থলে আধান বা চার্জগুলো আলাদা হয়ে একটি অতি সূক্ষ্ম স্তর তৈরি করে। মাইক্রোপোরাস বা ক্ষুদ্র ছিদ্রযুক্ত এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে যখন পানি প্রবাহিত হয়, তখন আয়নের স্থানান্তর ঘটে এবং এই স্থানান্তরের ফলে পরিমাপযোগ্য ভোল্টেজ বা বিভব তৈরি হয়। অর্থাৎ, পানির প্রবাহ এখানে সরাসরি ভোল্টেজে রূপান্তরিত হচ্ছে।

প্রকৃতির এই অনন্য স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গবেষক দলটি কৃত্রিম নমুনা তৈরি করেছেন। তারা থ্রিডি প্রিন্টিং (3D-printing) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিরামিক এবং পলিমারের মাধ্যমে এই গ্রেডিয়েন্ট সমৃদ্ধ 'কাঁটা' তৈরি করেছেন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই কৃত্রিম কাঠামোও পানির প্রবাহে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করতে সক্ষম। মজার বিষয় হলো, সাধারণ কাঠামোর তুলনায় এই গ্রেডিয়েন্ট বা স্তরীভূত কাঠামো কয়েক গুণ বেশি ভোল্টেজ উৎপন্ন করতে পারে, যা এই নকশার কার্যকারিতা প্রমাণ করে।

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কেবল সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত স্বয়ংক্রিয় বা সেলফ-পাওয়ার্ড আন্ডারওয়াটার সেন্সর তৈরির পথে একটি বিশাল পদক্ষেপ। এই ধরনের সেন্সরগুলো কোনো বাহ্যিক বিদ্যুৎ সংযোগ বা জটিল নেভিগেশন সিস্টেম ছাড়াই সমুদ্রের তলদেশের স্রোত এবং প্রবাহের মানচিত্র তৈরি করতে পারবে। এটি সমুদ্র গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে, যেখানে সেন্সরগুলো নিজেরাই নিজেদের শক্তি উৎপাদন করবে।

প্রকৃতির এই নিস্তব্ধ প্রযুক্তির উন্মোচন আমাদের গ্রহের সুর এবং ছন্দে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সমুদ্রের স্রোত এখন আর কেবল একটি প্রবাহ নয়, বরং এটি একটি বৈদ্যুতিক সুর হিসেবে ধরা দিচ্ছে—যা কোনো মাইক্রোফোনের মাধ্যমে নয়, বরং কাঠামোগত রূপের মাধ্যমে অনুভূত হয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি প্রযুক্তিকে লুকিয়ে রাখে না, বরং প্রকৃতি নিজেই প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্বাস নেয়; আমাদের কাজ হলো কেবল সেই ভাষা পড়তে শেখা।

2 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Nature

  • Composites B Eng

  • Semantic Scholar

  • ResearchGate

  • ResearchGate

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।