কেনিয়ায় হাতি প্রতিরোধে মৌমাছির বেড়ার কার্যকারিতা নিশ্চিত: একটি পরিবেশবান্ধব সমাধান

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

জীবন্ত মৌমাছির বাক্স ব্যবহার করে তৈরি উদ্ভাবনী বেড়া ব্যবস্থা কেনিয়ায় মানুষ ও হাতির মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনে একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হিসেবে ২০২৬ সালেও তার কার্যকারিতা প্রমাণ করে চলেছে। দেশটির অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম সংরক্ষিত বনাঞ্চল, সাভো ইস্ট ন্যাশনাল পার্কের (Tsavo East National Park) নিকটবর্তী অঞ্চলে প্রথমবার সফলভাবে পরীক্ষিত এই পদ্ধতিটি মূলত আফ্রিকান হাতিদের মৌমাছির আক্রমণ এড়িয়ে চলার সহজাত প্রবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।

২০২৪ সালের শেষের দিকে সম্পন্ন হওয়া একটি বিস্তৃত নয় বছরব্যাপী গবেষণায় ফসলের সুরক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই বিশেষ ধরনের বেড়াগুলো চাষাবাদের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে হাতির অনুপ্রবেশের প্রচেষ্টাকে গড়ে ৮৬.৩% ক্ষেত্রে সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘ নয় বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, প্রায় ৪০০০ হাতি সুরক্ষিত খামারগুলোর কাছাকাছি এসেছিল, যার মধ্যে মাত্র ২৫.১৮% (১০০৭টি হাতি) বেড়া ভাঙতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, ৬৬.২৪% ক্ষেত্রে হাতিরা হয় খামারের বাইরে অবস্থান করেছে অথবা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করেছে। এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো মৌমাছির গুঞ্জনের প্রতি হাতিদের অতিসংবেদনশীলতা, যা তাদের চোখ এবং শুঁড়ের মতো নাজুক স্থানে কামড়ের তীব্র যন্ত্রণার ভীতি তৈরি করে।

২০০৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞানী লুসি কিং (Lucy King) 'এলিফ্যান্ট অ্যান্ড বিস' (Elephant and Bees) নামক একটি পাইলট কর্মসূচি শুরু করেন, যেখানে ফসলি জমির সীমানা বরাবর প্রতি ১০ মিটার অন্তর মৌমাছির বাক্স স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিটি কেবল ফসলই রক্ষা করে না, বরং পরাগায়নে সহায়তা করার পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য আয়ের একটি অতিরিক্ত উৎসও তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত মধুকে 'এলিফ্যান্ট-ফ্রেন্ডলি হানি' বা 'হাতি-বান্ধব মধু' হিসেবে বাজারজাত করা হয়। নয় বছরের গবেষণায় ৩৩৮টি মৌমাছির বাক্স থেকে প্রায় ১০০০.১ কেজি কাঁচা মধু উৎপাদিত হয়েছে, যা কৃষকদের জন্য প্রায় ২২৫০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আয় নিশ্চিত করেছে।

তবে গবেষকরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই পদ্ধতির একটি বড় দুর্বলতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে আফ্রিকায় ক্রমবর্ধমান তীব্র খরা মৌমাছির বংশবৃদ্ধি এবং বাক্সে তাদের উপস্থিতিকে মারাত্মকভাবে হ্রাস করছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালের ভয়াবহ খরার ফলে পরবর্তী তিন বছরে মৌমাছির বাক্সে অবস্থানের হার এবং মধু উৎপাদন ৭৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এটি একদিকে যেমন কৃষকদের লাভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তেমনি হাতি প্রতিরোধের এই ব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যকারিতাকেও কিছুটা ম্লান করেছে। চরম আবহাওয়ার এই ঘনঘটা খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেনিয়ার প্রেক্ষাপটে, যেখানে ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ৫৯.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে হাতিদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে মৌমাছির বেড়ার মতো টেকসই এবং মানবিক সমাধানগুলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডঃ লুসি কিং-এর শুরু করা এই প্রকল্পটি এখন কেবল কেনিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বতসোয়ানা, মোজাম্বিক, তানজানিয়া, উগান্ডা এবং শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সামগ্রিকভাবে, মৌমাছির বেড়া কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, বরং এটি প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি সফল প্রচেষ্টা। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, তবুও এই উদ্ভাবনী পদ্ধতিটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের সাফল্য ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশেও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করবে।

6 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • okdiario.com

  • Save the Elephants

  • ESRI

  • Big3Africa.org

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।