চীনের দুনহুয়াং সিএসপি প্রকল্প: ঘনীভূত সৌরশক্তির মাধ্যমে দিনরাত নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক অনন্য নিদর্শন

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

চীনের দুনহুয়াং সিএসপি প্রকল্প: ঘনীভূত সৌরশক্তির মাধ্যমে দিনরাত নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক অনন্য নিদর্শন-1

চীনের দুনহুয়াং অঞ্চলে অবস্থিত ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ঘনীভূত সৌরবিদ্যুৎ (সিএসপি) কেন্দ্র বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। 'শৌহাং চায়না' (Shouhang China) নামক সংস্থার তৈরি এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রমাণ করেছে যে, সৌরশক্তি ব্যবহার করে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই বিশাল স্থাপনাটিতে প্রায় ১২,০০০ হেলিওস্ট্যাট বা আয়না ব্যবহার করা হয়েছে, যা সূর্যের আলোকে ২৬৩ মিটার উঁচু একটি তাপ-শোষণকারী টাওয়ারে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কেন্দ্রীভূত করে। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটি মূলত গলিত লবণের (molten salt) তাপ সঞ্চয় ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, যা বিশাল পরিমাণ তাপ ধরে রাখতে সক্ষম। পরবর্তীতে এই তাপ ৫০০° সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরাতে ব্যবহৃত হয়, যা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করে।

এই বিশেষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সরাসরি সূর্যালোক না থাকলেও এটি টানা ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে। সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে সাধারণত যে অস্থিরতা বা বিরতি দেখা যায়, এই প্রযুক্তি তা কার্যকরভাবে সমাধান করেছে। এর ফলে গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি সাধারণ ফটোভোলটাইক সিস্টেমের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য, কারণ এতে সমমানের স্থিতিশীলতা পেতে অতিরিক্ত ব্যাটারি স্টোরেজ সমাধানের প্রয়োজন হয় না। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে গ্রিডের সাথে যুক্ত হওয়া এই দুনহুয়াং কেন্দ্রটি চীনের জাতীয় নীতির একটি সফল উদাহরণ, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে গ্রিডের ভারসাম্য বজায় রাখতে সিএসপি প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করছে।

চীনের সিএসপি শিল্প বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হারকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে সিএসপি স্থাপনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১.৭ শতাংশ, যেখানে বিশ্বব্যাপী এই হার ছিল মাত্র ৪.২৪ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ নাগাদ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চীনে বর্তমানে ২১টি সচল সিএসপি কেন্দ্র রয়েছে যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১.৫৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট। এই অভাবনীয় সাফল্যের ফলে চীন বর্তমানে সিএসপি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এছাড়াও, দেশটিতে আরও ৩০টি সিএসপি প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে যার সম্মিলিত ক্ষমতা ৩.১০ মিলিয়ন কিলোওয়াট, যা চীনকে এই খাতের প্রধান বিশ্বনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

দুনহুয়াং-এর এই প্রযুক্তিতে তাপ পরিবাহক হিসেবে ব্যবহৃত গলিত লবণ ৫৬৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই উচ্চ তাপমাত্রা সন্ধ্যাবেলার পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে, যাকে বিশেষজ্ঞরা 'ডিসপ্যাচেবল পাওয়ার' হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রায় ৭.৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই কেন্দ্রটি প্রতি বছর প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পরিবেশগত দিক থেকে বিচার করলে, এটি বছরে প্রায় ৩৫০,০০০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমাতে সাহায্য করছে। প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি এবং ব্যাপক উৎপাদনের ফলে নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং বর্তমানে চীনের সিএসপি সরঞ্জামের ৯৫ শতাংশেরও বেশি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে।

চীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় বর্তমানে উপযুক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পন্ন অঞ্চলগুলোতে বড় আকারের সিএসপি কেন্দ্র স্থাপনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এই কেন্দ্রগুলো কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, বরং শিল্প কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় তাপ সরবরাহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশটির ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০) অনুযায়ী, চীন তাদের মোট সিএসপি উৎপাদন ক্ষমতা ১৫ গিগাওয়াটে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো সিএসপি প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের খরচ (LCOE) কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের খরচের সমান পর্যায়ে নিয়ে আসা, যা ভবিষ্যতে কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করবে।

5 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • MoneyControl

  • Advantech

  • Global 100 RE Ukraine

  • NLR

  • SolarPACES

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।