গাজা শান্তি পরিষদে যোগ দিচ্ছে বেলারুশ: ট্রাম্পের উদ্যোগে নতুন ভূ-রাজনৈতিক মোড়

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মিনস্কে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে নবগঠিত 'বোর্ড অফ পিস' বা শান্তি পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হতে সম্মত হয়েছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপটি মূলত ১৯ জানুয়ারি বেলারুশীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রুসলান ভারানকোভের মাধ্যমে প্রাপ্ত ট্রাম্পের একটি ব্যক্তিগত বার্তার পর গ্রহণ করা হয়। এই উদ্যোগটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনে একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, নবগঠিত এই সংস্থার কার্যপরিধি কেবল গাজার প্রাথমিক ম্যান্ডেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি মনে করেন, এই পরিষদ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব নিরসনে এবং একটি নতুন বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো বিনির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে, যা বেলারুশ গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করে আসছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি নিজেকে এই শান্তি পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেছেন, তার ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উপস্থাপিত এই পরিকল্পনাটি ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর রেজোলিউশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বৈধতা লাভ করে। উল্লেখ্য যে, নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৩টি দেশ এই রেজোলিউশনকে সমর্থন দিলেও রাশিয়া ও চীন ভোটদান থেকে বিরত ছিল।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর রেজোলিউশন অনুযায়ী, এই শান্তি পরিষদ একটি আন্তর্জাতিক আইনি মর্যাদাসম্পন্ন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে। এই প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হবে গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন কার্যক্রম সমন্বয় করা, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ (PNA) প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে এবং এই অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি বিশেষ দূত স্টিভেন উইটকফ এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের সূচনা ঘোষণা করেন। এই পর্যায়টি মূলত গাজার নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি টেকনোক্র্যাটিক বা বিশেষজ্ঞ-নির্ভর শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করবে, যা দীর্ঘমেয়াদী শান্তি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই পরিষদের সদস্যপদ লাভের আর্থিক শর্তাবলী নিয়ে মিনস্ক থেকে বিশেষ ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো সেই সব দাবি নাকচ করে দিয়েছেন যেখানে বলা হয়েছিল যে, যোগদানের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ১ বিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রয়োজন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কেবল তিন বছরের বেশি সময় ধরে সদস্যপদ বজায় রাখার জন্য বা স্থায়ী সদস্যপদের জন্য প্রযোজ্য। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে প্রথম তিন বছর অংশগ্রহণের জন্য কোনো প্রাথমিক আর্থিক বাধ্যবাধকতা নেই। লুকাশেঙ্কো আরও উল্লেখ করেছেন যে, বেলারুশ যদি শান্তির স্বপক্ষে কার্যকর এবং প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এই বিশাল ফি ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরিষদের খসড়া সনদে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ন্যূনতম ১ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিলের বিধান রাখা হয়েছে।

ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। নরওয়ের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেয়াস মটজফেল্ড ক্রাভিক অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন যে, নরওয়ের পক্ষে এই শান্তি পরিষদে যোগ দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। তার মতে, এই নতুন কাঠামোটি সরাসরি জাতিসংঘের ভূমিকা এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। ক্রাভিক জোর দিয়ে বলেন যে, নরওয়ে তার পররাষ্ট্রনীতিতে সর্বদা জাতিসংঘের ওপর আস্থা রাখে এবং এমন কোনো ব্যবস্থার অংশ হতে পারে না যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো কোনো ব্যক্তির হাতে একক ভেটো ক্ষমতা থাকবে। নরওয়ের এই অবস্থানের বিপরীতে মিনস্ক এই আমন্ত্রণকে লুকাশেঙ্কোর ব্যক্তিগত কৃতিত্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেলারুশের ক্রমবর্ধমান মর্যাদার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে।

বেলারুশ ছাড়াও ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া (ভ্লাদিমির পুতিন), ইতালি, হাঙ্গেরি এবং উজবেকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানদের এই পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যার মধ্যে পুতিনের আমন্ত্রণটি বর্তমানে বিবেচনাধীন রয়েছে। যদিও নরওয়ে এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে, ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী আমন্ত্রিত দেশের তালিকায় মিশর, কাতার, ইসরায়েল, তুরস্ক এবং ইউক্রেনসহ ৫০টিরও বেশি রাষ্ট্র রয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই উদ্যোগের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন, যার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ফরাসি ওয়াইন এবং শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এই নতুন জোট গঠন বিশ্ব রাজনীতিতে এক জটিল কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে, যা প্রথাগত আন্তর্জাতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে এক ভিন্নধর্মী প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • 5 канал

  • Open.kg

  • Anadolu Ajansı

  • Menafn

  • weareiowa.com

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।