মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে সঞ্চিত থাকা প্রায় ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসছে। এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপটি আসে ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করার তিন দিন পরে। ট্রাম্প মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৬, ২০২৬ তারিখে তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে নিশ্চিত করেন যে তেলবাহী জাহাজগুলো সরাসরি মার্কিন বন্দরে পরিবহন করা হবে।
এই বিপুল পরিমাণ তেল, যা ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক উৎপাদন হারের এক থেকে দুই মাসের সমতুল্য, বাজারদরে বিক্রি করা হবে এবং বিক্রিত অর্থের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে থাকবে। ট্রাম্পের দাবি, এই রাজস্ব ভেনেজুয়েলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। এই তেল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটকে নির্দেশ দিয়েছেন। ক্রিস রাইট নিশ্চিত করেছেন যে স্টোরেজ ট্যাংকারে থাকা তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আনলোডিং ডকে আনা হবে। এই পদক্ষেপটি ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, কারণ এই তেল পূর্বে চীনের দিকে যাচ্ছিল, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভেনেজুয়েলার তেলের বৃহত্তম ক্রেতা ছিল।
এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপের পটভূমিতে রয়েছে ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে সংঘটিত সামরিক অভিযান, যেখানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী কারাকাস থেকে মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। মাদুরো ১ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে মাদক পাচারের অভিযোগে আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং নিজেকে 'অপহরণের শিকার' হিসেবে ঘোষণা করেন। এই অভিযানের ফলে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ হিসেবে দেলসি রদ্রিগেজ শপথ গ্রহণ করেন, যিনি পূর্বে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ২০১৮ সাল থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন। রদ্রিগেজ এই মার্কিন পদক্ষেপকে 'অবৈধ সামরিক আগ্রাসন' এবং 'অপহরণ' বলে নিন্দা জানিয়েছেন, তবে একই সাথে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে সহযোগিতার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থা পেট্রোলিওস ডি ভেনেজুয়েলা (PDVSA)-এর উপর দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেশটির তেল শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঐতিহাসিকভাবে, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন দুই দশক আগে প্রায় ৩ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন থেকে কমে বর্তমানে ১ মিলিয়ন ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে, যার মূল কারণ নিষেধাজ্ঞা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থার অব্যবস্থাপনা। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (EIA) অনুসারে, ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই তেল মূলত ভারী ও ঘন, যা উত্তোলনের জন্য উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে মার্কিন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় নেতারা ন্যাটোর সমাপ্তি নিয়ে সতর্ক করেছেন। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন, যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের দাবি না মানেন তবে মাদুরোর চেয়েও 'বড় মূল্য' দিতে হতে পারে।
