ট্রাম্পের ‘পিস কাউন্সিল’ বা শান্তি পরিষদে যোগ দিতে নিউজিল্যান্ডের সরাসরি অস্বীকৃতি

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

নিউজিল্যান্ড সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘পিস কাউন্সিল’ বা শান্তি পরিষদে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি, শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে, ওয়েলিংটন বর্তমান কাঠামোতে এই পরিষদে অংশ নেবে না। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, নিউজিল্যান্ড এই পরিষদের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম এবং পরিস্থিতির ওপর গভীর নজরদারি অব্যাহত রাখবে। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড সেমোরের সাথে বিস্তারিত আলোচনার পর যৌথভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার্স তার বক্তব্যে নিউজিল্যান্ডের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, জাতিসংঘ (UN)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে নিউজিল্যান্ড সর্বদা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। নিউজিল্যান্ডের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, যেকোনো নতুন শান্তি পরিষদের কার্যক্রম অবশ্যই জাতিসংঘের সনদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং এটি যেন জাতিসংঘের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণেও নিউজিল্যান্ড এই পরিষদে যোগ দিতে আগ্রহী নয়। যেহেতু এই পরিষদের প্রাথমিক মনোযোগ গাজা উপত্যকার ওপর নিবদ্ধ এবং সেখানে ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, তাই নিউজিল্যান্ড মনে করে সেখানে তাদের পক্ষ থেকে নতুন কোনো বিশেষ অবদান রাখার সুযোগ নেই।

এই ‘পিস কাউন্সিল’ বা শান্তি পরিষদটি ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সংস্থাটি গঠনের শুরুতে এটিকে গাজা সংঘাত নিরসনে একটি বিশেষ মার্কিন উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর রেজোলিউশনের মাধ্যমে এই সংক্রান্ত একটি ম্যান্ডেট অনুমোদিত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, সংস্থাটির চূড়ান্ত রূপরেখায় গাজা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ ছিল না। এই পরিবর্তনটি নির্দেশ করে যে, ট্রাম্পের এই উদ্যোগটি কেবল আঞ্চলিক নয় বরং আরও বড় কোনো বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং সমালোচকরা এই পরিষদের গঠনতন্ত্র নিয়ে ইতিমধ্যে নানা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অনেকের মতে, এটি জাতিসংঘের সমান্তরাল একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিষদের নীতিমালায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আজীবন সভাপতিত্ব এবং যেকোনো সিদ্ধান্তে ভেটো প্রদানের ক্ষমতার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সদস্যপদ বজায় রাখার জন্য তিন বছর পর ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার শর্তটিও অনেক দেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিষদের কৌশলগত তদারকি এবং পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী বোর্ডটি সরাসরি ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে মার্কো রুবিও, জ্যারেড কুশনার এবং স্যার টনি ব্লেয়ারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা সদস্য হিসেবে রয়েছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলোর মধ্যে এই পরিষদে যোগদানের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরব, কাতার এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো ইতিমধ্যে এই পরিষদের বোর্ডে যোগ দিলেও, পশ্চিমা দেশগুলো এবং আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্ররা এই আমন্ত্রণের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কেবল হাঙ্গেরি এবং বুলগেরিয়া এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সদস্যপদ নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স, নরওয়ে এবং ক্রোয়েশিয়ার মতো দেশগুলো নিউজিল্যান্ডের মতোই এই প্রস্তাবের বিষয়ে তাদের রিজার্ভেশন বা সরাসরি অসম্মতি প্রকাশ করেছে। এই দেশগুলো মূলত বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন কোনো কাঠামোতে যুক্ত হতে অনীহা প্রকাশ করছে।

নিউজিল্যান্ডের এই সিদ্ধান্তটি মূলত পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতারই প্রতিফলন। জার্মানির মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছে যে, বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য তাদের কাছে ইতিমধ্যে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম রয়েছে এবং সেটি হলো জাতিসংঘ। নিউজিল্যান্ডের এই পদক্ষেপটি প্রমাণ করে যে, তারা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতা এবং প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই আস্থা রাখতে চায়। ট্রাম্পের এই নতুন উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পাবে, তা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে।

8 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Stiri pe surse

  • 1News

  • Chinadaily.com.cn

  • Al Jazeera

  • RNZ News

  • The Times of Israel

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।