মার্কিন-ভারত ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি: ট্রাম্প ও মোদীর নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি যুগান্তকারী বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন। এই চুক্তির ফলে ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সম্মিলিত শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইতিপূর্বে এই শুল্কের মধ্যে ২৫ শতাংশ মূল শুল্ক এবং ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ভারত কর্তৃক রাশিয়া থেকে তেল আমদানির প্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিল। বর্তমান সমঝোতা অনুযায়ী, নয়াদিল্লি রাশিয়া থেকে ছাড়কৃত মূল্যে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে এবং তার পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়েছে। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন তাদের শাস্তিমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এই চুক্তির আওতায় ভারত মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে সমস্ত শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর পাশাপাশি, আগামী বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এই চুক্তিকে একটি 'ঐতিহাসিক মোড়' হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন গতির সঞ্চার করবে।

তবে রুশ তেলের পরিবর্তে বিশ্ববাজারের মানদণ্ড অনুযায়ী তেল আমদানির ফলে ভারতের অর্থনীতিতে কিছু বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে চলতি অর্থবছরে ভারতের বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও, দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভারত এই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চুক্তির প্রধান শর্তাবলী নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে ভারতীয় পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক হার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।
  • ভারত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বাধা ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে।
  • রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভাব্য ভেনিজুয়েলা থেকে জ্বালানি আমদানিতে মনোনিবেশ করবে ভারত।
  • আগামী কয়েক বছরে ভারত ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের মার্কিন পণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই পদক্ষেপকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সহায়ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি মনে করেন, ভারতের এই সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়নের উৎস দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী মোদী এই চুক্তিকে একটি 'অসাধারণ ঘোষণা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ১.৪ বিলিয়ন ভারতীয় নাগরিকের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে বিশ্বের দুটি বৃহত্তম গণতন্ত্রের এই নিবিড় সহযোগিতা উভয় দেশের জনগণের জন্য অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি বয়ে আনবে।

এই আমদানির তালিকায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

  • অপরিশোধিত তেল, কয়লা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস।
  • উন্নত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং প্রতিরক্ষা সামগ্রী।
  • কৃষিজাত পণ্য এবং ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল।
  • বেসামরিক বিমান এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো।
  • ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য উচ্চ-প্রযুক্তির পণ্য।

এই ঘোষণার পর ভারতের শেয়ার বাজারে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। ভারতের প্রধান শেয়ার সূচক নিফটি ৫০ (Nifty 50) এক পর্যায়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ফলে ভারত রফতানি বাণিজ্যে চীন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের তুলনায় বিশেষ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবে, কারণ ওই দেশগুলোর ওপর মার্কিন শুল্ক হার ভারতের তুলনায় অনেক বেশি।

রাজনৈতিক অঙ্গনে এই চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই চুক্তিকে অস্পষ্ট আখ্যা দিয়ে সরকারের কাছে আরও বিস্তারিত তথ্য দাবি করেছে। তারা এই বিষয়ে সংসদে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে যাতে চুক্তির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।

বর্তমানে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতাকে চুক্তির কেবল প্রথম পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, একটি পূর্ণাঙ্গ এবং আরও ব্যাপকভিত্তিক চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য উভয় দেশের প্রতিনিধিরা কাজ চালিয়ে যাবেন। দীর্ঘদিনের শুল্ক যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক উত্তেজনার পর এই চুক্তিকে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

30 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • News.de

  • India News, Breaking News, Entertainment News | India.com

  • Landeszentrale für politische Bildung Baden-Württemberg

  • Ukrinform

  • Deutschlandfunk

  • GSV "Russia - Islamic World"

  • The Times of India

  • NDTV

  • The Times of India

  • Atlantic Council

  • The Sunday Guardian

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।