আবুধাবিতে ইউক্রেন নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা: সংঘাতের আবহে শান্তির সন্ধানে দ্বিতীয় দফার বৈঠক

লেখক: gaya ❤️ one

আবু ধাবিতে ইউক্রেন সম্পর্কে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা

আবুধাবি/কিভ/মস্কো, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ – সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাজধানী আবুধাবিতে ইউক্রেন, রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউক্রেনে প্রায় চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনের পথ খোঁজার লক্ষ্যেই এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম দিনের আলোচনাকে ইউক্রেনীয় পক্ষ 'ফলপ্রসূ' এবং 'সারগর্ভ' বলে অভিহিত করলেও তাৎক্ষণিক কোনো বড় সাফল্যের খবর পাওয়া যায়নি। ৫ ফেব্রুয়ারি এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ওই দিনই রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত 'নিউ স্টার্ট' (New START) চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মস্কো ইতিমধ্যে পারমাণবিক ক্ষেত্রে 'পাল্টা ব্যবস্থা' নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখায় আলোচনার টেবিলে বাড়তি উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এর আগে ২০২৬ সালের ২৩-২৪ জানুয়ারি আবুধাবিতে প্রথম দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যাকে 'গঠনমূলক' বলা হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান আসেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগেই এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটে, যেখানে তিনি নিজেকে এই সংঘাতের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ থামাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে আল শাতি প্যালেসে (Al Shati Palace) এই আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার স্বার্থে এই বৈঠকে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে।

এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন এক সময়ে চলছে যখন যুদ্ধক্ষেত্রে তীব্র লড়াই ও প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। ৩ ও ৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালায়, যদিও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে এক সপ্তাহের জন্য হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। দোনেৎস্ক অঞ্চলের দ্রুঝকিভকায় (Druzhkovka) একটি বাজারে ক্লাস্টার বোমা হামলায় অন্তত সাতজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ওডেসাসহ অন্যান্য শহরে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়াকে যুদ্ধবিরতির সুযোগ 'নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহারের' দায়ে অভিযুক্ত করেছেন এবং এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করেছেন। অন্যদিকে ক্রেমলিন স্পষ্ট জানিয়েছে যে, দনবাস থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং ক্রিমিয়ার দাবি ত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের বিশেষ সামরিক অভিযান চলবে।

আলোচনার বিন্যাসটি ত্রিপক্ষীয় রাখা হয়েছে, যেখানে একটি 'ইউ' (U) আকৃতির টেবিলে মার্কিন প্রতিনিধিরা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কেন্দ্রীয় আসনে বসছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে ইউক্রেনীয় এবং রুশ প্রতিনিধিরা একে অপরের মুখোমুখি বসেছেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে একটি 'বাফার' বা সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।

  • ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দল: এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের (SNBC) সচিব রুস্তম উমেরভ, যিনি বর্তমানে কিয়েভের প্রধান আলোচক। তার সাথে রয়েছেন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের প্রধান এবং গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান কিরিলো বুদানভসহ অন্যান্য সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা।
  • রুশ প্রতিনিধি দল: মস্কোর প্রতিনিধি দলে মূলত সামরিক কর্মকর্তাদের আধিপত্য দেখা গেছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ (GRU)-এর প্রধান ইগর কস্তিউকভ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে রাশিয়া মূলত সামরিক-প্রযুক্তিগত দিক এবং সেনা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
  • মার্কিন প্রতিনিধি দল: ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, তার জামাতা ও অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন সেনাসচিব ড্যানিয়েল ড্রিসকল এই দলে রয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন যে, দীর্ঘ সময় পর ইউক্রেন ও রাশিয়ার কারিগরি দলগুলো মার্কিন বিশেষজ্ঞদের সাথে সরাসরি বসছে, যা একটি বড় অগ্রগতি।

লজিস্টিক সমস্যার কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও ৪ ফেব্রুয়ারি সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হয়। রুস্তম উমেরভ তার টেলিগ্রাম চ্যানেলে নিশ্চিত করেছেন যে ইউক্রেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের একটি বেনামী সূত্রও প্রথম দিনটিকে অত্যন্ত 'ফলপ্রসূ' বলে বর্ণনা করেছে।

আলোচনার মূল বিষয়গুলো অত্যন্ত জটিল এবং উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আলোচনার প্রধান এজেন্ডাগুলো হলো:

  • সেনা প্রত্যাহার ও বাফার জোন: সংঘাত এড়াতে এবং স্থায়ী শান্তি ফেরাতে কোথায় এবং কীভাবে 'বাফার জোন' তৈরি করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে।
  • ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কাঠামো: ইউক্রেনের নিরপেক্ষ অবস্থান, ন্যাটোর সদস্যপদ ছাড়াই নিরাপত্তার গ্যারান্টি এবং দনবাস, ক্রিমিয়া ও জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো অধিকৃত অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতি।
  • সংঘাত প্রশমন ও মানবিক সহায়তা: অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, বন্দি বিনিময় এবং সাম্প্রতিক হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি খাত পুনর্গঠনে সহায়তা।
  • আঞ্চলিক ছাড়ের প্রশ্ন: রাশিয়া দোনেৎস্ক অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানালেও জেলেনস্কি তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, দেশের ভূখণ্ড বিসর্জন দিয়ে কোনো শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়।

ক্রেমলিন এই আলোচনাকে তাদের দীর্ঘমেয়াদী দাবিগুলো আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যার মধ্যে ন্যাটোর সম্প্রসারণ রোধ অন্যতম। তারা ২০২৫ সালের 'আলাস্কা সামিট'-কে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা গ্যারান্টি না পেলে মস্কো কোনো বড় ধরনের আপস করতে রাজি হবে না।

ইউক্রেন এই সংলাপকে ইতিবাচকভাবে নিলেও তাদের মধ্যে গভীর সংশয় কাজ করছে। জেলেনস্কি সাম্প্রতিক হামলার পর তার প্রতিনিধি দলকে নতুন করে নির্দেশনা দিয়েছেন। রাশিয়ার মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ কঠোর অবস্থানে অনড় থেকে বলেছেন যে, তাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আলোচনাকে 'নিউ স্টার্ট' চুক্তির সাথে যুক্ত করে একটি নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার মানসিকতা দেখে কিছুটা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এবং একে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ এই সংলাপকে স্বাগত জানালেও সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে। ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলো মস্কোর সাথে যোগাযোগ পুনরায় শুরুর বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে, আর ন্যাটো সীমান্ত এলাকায় তাদের নজরদারি আরও বাড়িয়েছে। এদিকে মার্কিন-ইরান আলোচনা বাতিল হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তির আশা করছেন না। সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে বসন্তের আগে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কাঠামো তৈরি করা অথবা আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়া। পলিটিকো (POLITICO) এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে যে, এই আলোচনার ফলাফলই বলে দেবে পুতিন আসলে কতটা আন্তরিক। ৫ ফেব্রুয়ারির বৈঠকের পর পরবর্তী দফার আলোচনার সময়সূচী ঘোষণা করা হতে পারে।

3 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।