গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা: ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ চুক্তির রূপরেখা

লেখক: gaya ❤️ one

২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি দাভোসে বিশ্ব কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের মধ্যে একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠকের পর, ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ গ্রিনল্যান্ড এবং সমগ্র আর্কটিক অঞ্চলের জন্য একটি 'ভবিষ্যৎ চুক্তির রূপরেখা' ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার ফলে ইউরোপীয় আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি যেমন অপসারিত হয়েছে, তেমনি ট্রান্স-আটলান্টিক জোটকে আরও শক্তিশালী করার পথ প্রশস্ত হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ড সংকটের সূত্রপাত হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর, ট্রাম্প ২০১৯ সালে প্রথম উত্থাপন করা গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের ধারণাটি পুনরায় সামনে আনেন। ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে মাত্র ৫৭ হাজার মানুষের বসবাস হলেও এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের বিরল খনিজ সম্পদ এবং ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাওয়ায় আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নৌপথ এবং সম্পদের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা এই অঞ্চলকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ৯ জানুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, 'তারা পছন্দ করুক বা না করুক, আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু একটা করবই।' এই বক্তব্যটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং ডেনমার্কের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করে।

এরপর ১৭ জানুয়ারি ট্রাম্প হুমকি দেন যে, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড—এই আটটি ইউরোপীয় দেশ থেকে আমদানির ওপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০% শুল্ক আরোপ করা হবে। যদি 'পূর্ণ ক্রয়ের' বিষয়ে কোনো সমঝোতা না হয়, তবে জুনের মধ্যে এই শুল্ক ২৫% পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়, যেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা 'গ্রিনল্যান্ড বিক্রয়ের জন্য নয়' স্লোগান নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে।

তবে ২১ জানুয়ারি দাভোসে মার্ক রুটের সাথে বৈঠকের পর ট্রাম্পের সুরে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তিনি জানান যে, একটি ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড এবং আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়ে একটি কাঠামোগত সমঝোতা হয়েছে। বর্তমানে এই আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্ক রুটে নিশ্চিত করেছেন যে, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রে ন্যাটোর মিত্রদের সক্রিয় ভূমিকা দেখা যাবে। এই চুক্তির একটি প্রধান লক্ষ্য হলো আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করা। রাশিয়া বর্তমানে তার আর্কটিক নৌবহর সম্প্রসারণ করছে এবং চীন গ্রিনল্যান্ডের খনিজ প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

চুক্তির একটি অন্যতম প্রধান অংশ হলো 'গোল্ডেন ডোম' বা স্বর্ণালী গম্বুজ। এটি ইসরায়েলের 'আয়রন ডোম'-এর আদলে তৈরি একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যাতে মহাকাশ-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ১৯৫১ সালের মার্কিন-ডেনমার্ক চুক্তির ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ডের থুলে (Thule) ঘাঁটির মতো মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সার্বভৌম ঘাঁটি বা অ্যান্ডোরার যৌথ সার্বভৌমত্বের মডেলগুলো এখানে আলোচনার টেবিলে থাকতে পারে। খনিজ সম্পদের অধিকার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য খনিজ সম্পদের অধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে বিরল খনিজ বাজারের ৮০% চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা থেকে বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা কমানো এই চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য।

এই চুক্তির প্রধান দিকগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

  • আর্কটিক নিরাপত্তা: রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে ন্যাটোর উপস্থিতি জোরদার করা এবং নৌপথ রক্ষা করা।
  • গোল্ডেন ডোম: গ্রিনল্যান্ডে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন।
  • খনিজ অধিকার: বিরল খনিজ এবং ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
  • সার্বভৌমত্ব: ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান জানিয়ে সহযোগিতার নতুন মডেল তৈরি করা।
  • অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন-ইউরোপীয় বাণিজ্য রক্ষা এবং শুল্ক যুদ্ধ এড়ানো।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এই সংলাপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না, তবে ন্যাটোর মিত্র হিসেবে 'গোল্ডেন ডোম' বা আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় ডেনমার্ক উন্মুক্ত। গ্রিনল্যান্ডের নেতা আয়াজা কেমনিটজ শুল্কের হুমকি প্রত্যাহারে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, তবে তিনি জোর দিয়েছেন যে কোনো সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ম্যাথিউ ক্রোয়েনিগ মনে করেন, এটি ট্রাম্পের বিশেষ 'ডিল-মেকিং' স্টাইল, যেখানে তিনি হুমকিকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে জশ লিপস্কি সতর্ক করেছেন যে, ইউরোপ আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও ভবিষ্যতে নতুন কোনো হুমকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী গ্যারান্টি প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যেমন ফক্স নিউজ ও পলিটিকো-তে এই ঘটনাকে ন্যাটোর জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, এই ঘটনাটি দেখায় যে কীভাবে কূটনীতির মাধ্যমে একটি সংঘাতকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানো গেছে এবং আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ প্রকল্পের পথ প্রশস্ত হয়েছে। ২০২৬ সাল হতে পারে আর্কটিকের জন্য একটি নতুন সূচনার বছর, যেখানে নতুন সামরিক ঘাঁটি এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে অঞ্চলটি স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রতীকে পরিণত হবে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত বিজয় এবং ইউরোপের জন্য ঐক্যের নতুন বার্তা।

36 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Reuters

  • New York Times

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।