২০২৬ সালের জানুয়ারিতে উদীয়মান বাজারে রেকর্ড মূলধন প্রবাহ: ক্যারি-ট্রেডের প্রভাব ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush
ইন্সটিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (IIF) ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে উদীয়মান বাজারগুলোতে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের এক অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক প্রবাহ লক্ষ্য করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই মাসে নিট মূলধন প্রবাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। গত একুশ বছরের ইতিহাসে জানুয়ারি মাসের জন্য এটিই সর্বোচ্চ রেকর্ড। এই পরিসংখ্যানটি ২০১৮ সালের জানুয়ারির পূর্ববর্তী রেকর্ড ৭৪.৪ বিলিয়ন ডলারকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রেকর্ডকৃত ৩২.৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে এই মূলধন আকর্ষণ ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কৌশলগত, যেখানে মেক্সিকোর মতো দেশগুলো 'রিশোরিং' বা উৎপাদন কেন্দ্র স্থানান্তরের সুবিধার কারণে এবং এশিয়ার নির্দিষ্ট কিছু উদীয়মান বাজার বিনিয়োগকারীদের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে।
এই বিশাল মূলধন প্রবাহের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে 'ক্যারি-ট্রেড' কৌশল। IIF-এর সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জোনাথন ফরচুন ব্যাখ্যা করেছেন যে, বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মধ্যে সুদের হারের বিশাল পার্থক্যকে বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজে লাগিয়েছেন। বিশেষ করে জাপানি ইয়েন এবং মেক্সিকান পেসোর মধ্যে বিদ্যমান সুদের হারের ব্যবধান এই বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করেছে। ব্যাংক অফ মেক্সিকোর (Banxico) গভর্নর ভিক্টোরিয়া রদ্রিগেজ সেজা এই পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, বাজারে অস্থিরতা বা ভোলাটালিটি কম থাকায় মেক্সিকো এবং উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সুদের হারের পার্থক্যের সুবিধা নিয়ে ক্যারি-ট্রেড অবস্থান তৈরি করা সহজ হয়েছে। তবে IIF বিশ্লেষকরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে, বিশ্বজুড়ে মুদ্রানীতি স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের প্রবাহ স্থিতিশীল নাও হতে পারে।
ভবিষ্যতে এই বিনিয়োগ প্রবাহের ধারাবাহিকতা নির্ভর করবে মার্কিন ডলারের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকির অনুপস্থিতির ওপর। তবে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে, আগামীতে বিভিন্ন দেশ এবং আর্থিক উপকরণের মধ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বেশি পার্থক্য বা বৈচিত্র্য দেখা দেবে। যদিও সামগ্রিক মূলধন প্রবাহ বিনিয়োগকারীদের আশাবাদকে প্রতিফলিত করে, তবুও লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। IIF-এর মতে, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় এবং ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ২০২৬ সালে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মেক্সিকোতে গভর্নর রদ্রিগেজ সেজার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩.০% মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে সুদের হার আরও কমানোর পরিবেশ বিদ্যমান বলে উল্লেখ করেছে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রচেষ্টা।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে লাতিন আমেরিকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ২.২ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। উদীয়মান বাজারগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ আসলেও, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতাও লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি শেষ হওয়া সপ্তাহে ইক্যুইটি ফান্ডগুলোতে নিট প্রবাহ ছিল মাত্র ২.২ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা রেকর্ড ১৪৮.৫ বিলিয়ন ডলার মানি মার্কেট ফান্ডে সরিয়ে নিয়েছেন, যা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আটক এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া বক্তব্যের মতো ঘটনাগুলো এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাকে আরও উসকে দিয়েছে।
২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও এক বিশাল আর্থিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যেখানে তাদের প্রায় ৯.২ থেকে ৯.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের সরকারি ঋণ পুনর্অর্থায়ন করতে হবে। এটি দেশটির মোট বাজার ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, এবং বর্তমানে এই ঋণের চাহিদার কাঠামো অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ যেমন চিলি, পেরু এবং আর্জেন্টিনাও ২০২৬ সালের শুরুতে ইতিবাচক অর্থনৈতিক ফলাফল দেখিয়েছে। কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক সংস্কারের ফলে এই দেশগুলোর শেয়ার বাজার ও জাতীয় মুদ্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে রাশিয়ার ক্ষেত্রে; ভারতের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়ার জ্বালানি খাত থেকে আয় অর্ধেক কমে ৩৯৩.৩ বিলিয়ন রুবেলে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন। পরিশেষে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসটি একদিকে যেমন বিনিয়োগের জোয়ার দেখেছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ভঙ্গুরতাকেও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
9 দৃশ্য
উৎসসমূহ
El Economista
El Economista
Noticias Vertex AI Search
El Financiero
Bloomberg Línea
Valora Analitik
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।