আর্কটিক উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান গ্রিনল্যান্ডের: ডেনমার্কের সাথেই থাকার সিদ্ধান্ত
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে গ্রিনল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যেকোনো সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে এবং ডেনমার্কের রাজতন্ত্রের অংশ হিসেবে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। কোপেনহেগেনে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন একটি যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন। এই বিবৃতিতে তারা দ্বীপটির সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণের নেওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষী বক্তব্যের একটি সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। গ্রিনল্যান্ডে বিরল খনিজ পদার্থসহ প্রচুর পরিমাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার রয়েছে, যা বর্তমান বিশ্ববাজারে চীন ও রাশিয়ার সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতায় একটি অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিলসেন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, যদি কখনও কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখে গ্রিনল্যান্ডকে বেছে নিতে হয়, তবে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ডেনমার্ককেই বেছে নেবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, গ্রিনল্যান্ড কোনো বিক্রির বস্তু নয় এবং এর ভবিষ্যৎ কেবল গ্রিনল্যান্ডের জনগণই তাদের স্বায়ত্তশাসন আইন অনুযায়ী নির্ধারণ করবে।
প্রধানমন্ত্রী নিলসেনের এই কঠোর অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা এই ধরনের রাজনৈতিক চাপকে "সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য" বলে অভিহিত করেছেন। ফ্রেডেরিকসেন আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ বা হস্তক্ষেপের অর্থ হবে ন্যাটো (NATO) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর অবসান। গ্রিনল্যান্ডের বর্তমান জোট সরকারও কোনো অবস্থাতেই অন্য কোনো দেশের সাথে একীভূত না হওয়ার বিষয়ে তাদের অনড় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং নিজস্ব গ্রিনল্যান্ডীয় পরিচয় ও সংস্কৃতি রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রস্তাবের বিপক্ষে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। 'ইনুইট আতাকাতিগিট' (Inuit Ataqatigiit) দলের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আয়া কেমনিৎস এই জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, "গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয় এবং গ্রিনল্যান্ড কখনোই বিক্রি করা হবে না।" এই বলিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান দ্বীপটির স্বায়ত্তশাসনের অধিকার এবং ডেনমার্কের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতি গভীর আনুগত্যকেই প্রকাশ করে।
এই কূটনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে ডেনিশ কর্তৃপক্ষ পূর্ব আটলান্টিকে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের প্রতি তাদের সমর্থন নিশ্চিত করেছে। উল্লেখ্য যে, এর এক সপ্তাহ আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের দায়ে একটি পণ্যবাহী জাহাজ আটক করা হয়েছিল। এই অভিযানটি ছিল ৩ জানুয়ারি, ২০২৬-এ পরিচালিত "অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ"-এর একটি অংশ, যার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়েছিল। রুশ পতাকাবাহী "মারিনেরা" নামক একটি ট্যাঙ্কার ক্যারিবীয় সাগর থেকে ধাওয়া করার পর উত্তর আটলান্টিকে আটক করা হয়। মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সচিব ক্রিস্টি নোয়েম এই ধরনের পদক্ষেপকে "মাদক-সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করার" একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তি দেখিয়েছেন।
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাশিয়া ও চীনের প্রভাব প্রতিহত করতে গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার উল্লেখ করে আসছেন। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে ওয়াশিংটনে একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকের সময়সূচী নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লক্কে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মটজফেল্ড ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সভাপতিত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, তারা সমগ্র ব্লকের উদ্বেগ নিরসনে এবং আর্কটিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে "পরবর্তী পদক্ষেপ" নিয়ে কাজ করছেন। ঐতিহাসিকভাবে, ডেনিশ কমনওয়েলথের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ন্যাটোর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। ১৯৫১ সালের একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পিটুফিক (Pituffik) সহ গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক সামরিক চুক্তি এবং নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণগুলো বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন মোড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
6 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Al Jazeera Online
Deutsche Welle
Newsweek
High North News
Euractiv
The Local Denmark
Reuters (via China Daily source)
The Guardian
laSexta.com
Infobae
SWI swissinfo.ch
Hondudiario
La Vanguardia
The Washington Post
Courthouse News Service
Newsweek
The Associated Press
Stratfor
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
