২০২৬ সালের ৫ মার্চের মধ্যে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার সামরিক সংঘাত ষষ্ঠ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এই অভিযানের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে 'অপারেশন লায়ন্স রোর' এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' হিসেবে অভিহিত করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে শুরু হওয়া এই সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং তাদের নৌ-শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়া। এর ফলে জোট বাহিনী ইরানের প্রধান শহরগুলোর আকাশে নিজেদের আকাশসীমা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। প্রাথমিক এই হামলাগুলোতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সায়্যিদ আলী খামেনি এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক সচিব আলী শামখানিসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইরান এই হামলার জবাবে 'অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪' শুরু করেছে, যার আওতায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এবং বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক পাল্টা হামলা চালানো হয়। ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ দ্বিতীয় একটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত করলে আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া এমকে ৪৮ (Mk 48) টর্পেডোর আঘাতে ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা (IRIS Dena) নিমজ্জিত হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, 'মৌজ' শ্রেণির এই ফ্রিগেটে প্রায় ১৮০ জন আরোহী ছিলেন, যাদের মধ্যে মাত্র ৩২ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং অন্তত ৮৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ এই ঘটনাকে 'সাইলেন্ট ডেথ' বা 'নিভৃত মৃত্যু' বলে বর্ণনা করেছেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন টর্পেডোর আঘাতে কোনো শত্রু জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার প্রথম ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে রাশিয়ার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূ-রাজনৈতিক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর পর তেহরান থেকে সামরিক সহায়তার জোরালো অনুরোধ জানানো হলেও মস্কো এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রয়েছে। চ্যাপম্যান হাউসের বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিন এবং গ্রেগোয়ার রুস মনে করেন যে, সরাসরি সংঘাত এড়াতে মস্কো হয়তো কোনো গোপন সমঝোতায় রয়েছে, তাই তাদের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। যদিও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাকে 'চরম আগ্রাসন' বলে নিন্দা জানিয়েছেন, তবুও ক্রেমলিনের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো কূটনীতি এবং 'ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর' (INSTC) নামক বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া ও ইরান রাশত-আস্তারা রেললাইন নির্মাণের চুক্তি চূড়ান্ত করেছে, যা আইএনএসটিসি প্রকল্পের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১.৬ বিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া এই প্রকল্পটিকে তাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সামরিক অভিযানের প্রতি জোরালো সমর্থন লক্ষ্য করা গেছে। ৫ মার্চ মার্কিন সিনেট একটি যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, যা মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের ক্ষমতাকে সীমিত করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর শাকিব মেহর এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে, তেহরানের এই পাল্টা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণভাবে আত্মরক্ষার অধিকারের শামিল।
যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র তথ্য যুদ্ধও চলমান রয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে যে তারা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন (USS Abraham Lincoln) ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে, যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি (IRIB)-এর বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। ৪ মার্চ পর্যন্ত ইরানের শহীদ ও প্রবীণ বিষয়ক সংস্থার তথ্যমতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১২৩০ জন, যেখানে মানবাধিকার সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) ১১১৪ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) জানিয়েছে যে তারা এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০০ গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবশিষ্ট কমান্ড সেন্টারগুলোতে আরও গভীর ও বিধ্বংসী হামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।



