USA এবং আর্মেনিয়া একটি পারমাণবিক চুক্তি সই করেছে।
পারমাণবিক শক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্র ও আর্মেনিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর
সম্পাদনা করেছেন: an_lymons
২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জন ডেভিড ভ্যান্স এবং আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তিটি মূলত ১৯৫৪ সালের মার্কিন পারমাণবিক শক্তি আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী সম্পাদিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে '১২৩ চুক্তি' নামে পরিচিত।
এই আইনি কাঠামোটি মূলত বেসামরিক পারমাণবিক খাতে দুই দেশের মধ্যে গভীর সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করবে। এই চুক্তির মাধ্যমে আর্মেনিয়া উন্নত মার্কিন পারমাণবিক প্রযুক্তিতে প্রবেশের সুযোগ পাবে, যা দেশটির জ্বালানি খাতের আধুনিকায়নে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে।
চুক্তির আর্থিক রূপরেখা অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন পারমাণবিক সরঞ্জাম এবং আনুষঙ্গিক পরিষেবার জন্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এটি আর্মেনিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে আমূল বদলে দেওয়ার এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানোর একটি বিশাল সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ এবং রক্ষণাবেক্ষণ পরিষেবার জন্য আরও ৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই নথির ফলে মার্কিন সংস্থাগুলো এখন থেকে আর্মেনিয়ার বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির আওতায় নতুন বিদ্যুৎ ইউনিট নির্মাণ এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর আধুনিকায়নে সরাসরি অংশ নিতে পারবে।
বর্তমানে আর্মেনিয়ার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ মেটানো হয় মেটসামোরে অবস্থিত দেশটির একমাত্র সক্রিয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। এই কেন্দ্রটি দীর্ঘকাল ধরে দেশটির শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে এবং এর ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি।
মেটসামোর স্টেশনটি সোভিয়েত আমলের তৈরি ভিভিইআর-৪৪০ (VVER-440) রিঅ্যাক্টর দ্বারা সজ্জিত, যা ১৯৮০ সালে গ্রিডের সাথে যুক্ত হয়েছিল। পুরনো প্রযুক্তির এই রিঅ্যাক্টরটি বর্তমানে তার আয়ুষ্কালের শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আর্মেনীয় কর্তৃপক্ষ আগামী ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এই পুরনো বিদ্যুৎ ইউনিটটি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়ার বা ডি-কমিশনিং করার পরিকল্পনা করছে। এর পরিবর্তে একটি নতুন শক্তিশালী রিঅ্যাক্টর অথবা আধুনিক মডুলার রিঅ্যাক্টর স্থাপনের মাধ্যমে জ্বালানি ঘাটতি মেটানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য প্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর নাম গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর্মেনিয়া তার জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে আগ্রহী।
নতুন বিদ্যুৎ ইউনিটের নকশা ও কারিগরি দিকগুলো পর্যালোচনার জন্য ২০২৪ সালে একটি বিশেষ কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এই কোম্পানির মূল দায়িত্ব হলো বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিকল্প, সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা।
২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে কোন ধরনের রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হবে এবং কোন দেশের প্রযুক্তি গ্রহণ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তটি আর্মেনিয়ার আগামী কয়েক দশকের জ্বালানি নিরাপত্তার গতিপথ নির্ধারণ করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই চুক্তিটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এটি দেশটির পারমাণবিক প্রকৌশল, সরঞ্জাম উৎপাদন এবং জ্বালানি চক্রের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলোর জন্য একটি নতুন এবং লাভজনক বাজার উন্মুক্ত করবে।
এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে মার্কিন সংস্থাগুলো নতুন কার্যাদেশ পাবে, যা তাদের বৈশ্বিক পারমাণবিক বাজারে অবস্থান আরও সুসংহত করবে। এটি মার্কিন প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একটি নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, আর্মেনিয়ার জন্য '১২৩ চুক্তি' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সংবেদনশীল প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো প্রদান করে। এই বিশেষ চুক্তি ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের কাছে পারমাণবিক সরঞ্জাম বা জ্বালানি রপ্তানি করার আইনি অধিকার রাখে না।
এই চুক্তির ফলে আর্মেনিয়া এখন তাদের জ্বালানি আমদানির উৎসগুলোতে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ পাবে। একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মেটসামোর কেন্দ্রের বিকল্প হিসেবে ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর (SMR) ব্যবহারের সম্ভাবনা আর্মেনিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নমনীয়তা এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারে। এটি আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
পরিশেষে, এই চুক্তিটি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং এটি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত সম্পর্কের প্রতিফলন। এর মাধ্যমে আর্মেনিয়া তার জ্বালানি খাতকে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।
উৎসসমূহ
Crf.org
Bloomberg
