ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী পরিচালক আলী আসগারির নির্মিত নতুন ব্যঙ্গাত্মক চলচ্চিত্র 'ডিভাইন কমেডি' (মূল নাম 'কোমেডি এলাহি') ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি ইতালির প্রেক্ষাগৃহগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শিত হতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালে ৮২তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মর্যাদাপূর্ণ 'ওরিজোন্তি' বিভাগে এই শিল্পকর্মটি বিশেষ স্বীকৃতি ও প্রশংসা অর্জন করে। চলচ্চিত্রটি মূলত ইরানের বর্তমান আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি এবং এর অসংগতির বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ শৈল্পিক প্রতিবাদ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।
বলোনিয়ায় চলচ্চিত্র বিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পরিচালক আসগারি মনে করেন যে, এই ছবির হাস্যরস মূলত নিপীড়নের চরম অযৌক্তিকতা থেকেই উদ্ভূত হয়েছে, যা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার একটি নীরব কৌশল হিসেবে কাজ করে। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাহরাম নামের একজন চল্লিশ বছর বয়সী চলচ্চিত্র নির্মাতা। ইরানের সংস্কৃতি ও ইসলামি দিকনির্দেশনা মন্ত্রণালয়ের কঠোর সেন্সরশিপের কারণে তার কোনো কাজই ইতিপূর্বে নিজ দেশে প্রদর্শনের অনুমতি পায়নি। সেন্সরদের বিচিত্র সব দাবির একটি উদাহরণ হলো ছবিতে কুকুরের উপস্থিতি নিষিদ্ধ করা, যা ইসলামি নীতিমালার দোহাই দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এটি ইরানি নির্মাতাদের প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করা কঠোর ও অদ্ভুত বিধিনিষেধের একটি বাস্তব প্রতিফলন।
বাহরামের এই ট্র্যাজিকোমিক যাত্রাটি ডার্ক হিউমারে ভরপুর, যা অনেক সমালোচককে বিশ্বখ্যাত নির্মাতা উডি অ্যালেন এবং ন্যানি মোরেত্তির কাজের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর বাহরাম গোপনে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনের একটি দুঃসাহসিক মিশনে নামেন। এই অভিযানে তার সঙ্গী হন তরুণ প্রযোজক সাদাফ, যার উজ্জ্বল গোলাপি রঙের ভেসপা স্কুটারটি তাদের এই যৌথ প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়। অভিনেত্রী সাদাফ আসগারি এই ছবিতে নিজের একটি কাল্পনিক সংস্করণে অভিনয় করেছেন। বাস্তব জীবনেও কান চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেওয়ার কারণে ইরানে তার কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, যা তার চরিত্রে এক গভীর প্রামাণিকতা যোগ করেছে।
এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রটি সেভেন স্প্রিংস পিকচার্স, তাত ফিল্মস, জো ফিল্মস, সল্ট ফর সুগার ফিল্মস এবং ফিল্মস স্টুডিও জেনট্রাল-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়েছে। এটি ইরান, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি এবং তুরস্কের একটি যৌথ প্রযোজনা। বর্তমানে ইরানে চলমান বিক্ষোভ এবং ইন্টারনেট বিভ্রাটের কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় পরিচালক আলী আসগারি নিজে তেহরান ত্যাগ করতে না পারলেও, ইতালিতে তার ছবির প্রদর্শনীগুলো পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী চলছে। আসগারির চলচ্চিত্র জীবন ইতালিতে বিশেষভাবে সম্মানিত। ২০২৩ সালে কানে 'টেরেস্ট্রিয়াল ভার্সেস' প্রদর্শনের পর তিনি আট মাস দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে বলোনিয়ার চারশ বছরের পুরনো সিনটেকা ১৩ জানুয়ারি থেকে একটি বিশেষ রেট্রোস্পেক্টিভ শুরু করেছে, যা তার ছাত্রজীবনের স্মৃতিবিজড়িত শহরের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে।
চলচ্চিত্রটির মূল প্রতিপাদ্য নায়কের একটি গভীর আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে, যেখানে সে বলে: "আমি কেবল একজন মানুষ হিসেবে গণ্য হতে আমার চলচ্চিত্রটি দেখাতে চাই।" এই মুক্তিটি মূলত সীমাবদ্ধ শাসনব্যবস্থার অধীনে শৈল্পিক স্বাধীনতার জন্য চলমান সংগ্রামকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে, যেখানে একটি সাধারণ প্রাণীর চিত্রায়নও সেন্সরশিপের কারণ হতে পারে। জাফর পানাহির মতো প্রখ্যাত ইরানি নির্মাতারাও সেন্সরশিপের সাথে আপস না করায় কারাদণ্ড ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছেন, যা আসগারির কাজকে একটি বৃহত্তর প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশে পরিণত করেছে। আসগারির মতে, 'কাফকা ইন তেহরান' সহ তার পূর্ববর্তী কাজগুলো গোপনে প্রচারিত হয়ে ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। এটি স্পষ্ট করে যে, অনেক ইরানি নির্মাতার জন্য তাদের শিল্পকে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একমাত্র বৈধ পথ এখন বিদেশের মাটি।



