ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সময় খারকিভ মেট্রোপলিটন সাবওয়েতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া শিশুদের জীবন নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘ফটোফোবিয়া’ বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা ও স্বীকৃতি পাচ্ছে। স্লোভাকিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র এবং ইউক্রেনের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি সরাসরি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের মাটিতেই চিত্রায়িত হয়েছে। পরিচালক জুটি ইভান ওস্ট্রোখোভস্কি এবং পাভোল পেকারচিক, যারা এর আগে ২০১৩ সালে ‘ভেলভেট টেররিস্টস’ নামক চলচ্চিত্রে সফলভাবে কাজ করেছিলেন, এই নতুন গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছেন ১২ বছর বয়সী কিশোর নিকিতা এবং তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ভিকাকে।
এই শিশুরা দীর্ঘ সময় ভূগর্ভস্থ পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছিল, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদের চরম অভাব এবং প্রতিনিয়ত এক অজানা আশঙ্কার মধ্যে তাদের দিন কাটত। ‘ফটোফোবিয়া’ চলচ্চিত্রটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর সংকর বা হাইব্রিড প্রকৃতি, যা মাটির চার মিটার গভীরে অবস্থিত একটি বোম্ব শেল্টারের রূঢ় বাস্তবতার সাথে ওপরের ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের খণ্ডচিত্রের এক তীব্র বৈপরীত্য ফুটিয়ে তোলে। পরিচালকদ্বয় ২০২২ সালের বসন্তকালে মানবিক সহায়তা নিয়ে ইউক্রেনে গিয়েছিলেন এবং সেখানে প্রায় চার মাস অবস্থান করে যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও অকৃত্রিম মানবিকতা ও সহমর্মিতার মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করার নিরলস চেষ্টা চালিয়েছেন।
৭১ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই প্রভাবশালী চলচ্চিত্রটি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৮০তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘জর্নাতে দেগলি অটোরি’ বিভাগে সেরা ইউরোপীয় চলচ্চিত্র হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘ইউরোপা সিনেমাস লেবেল অ্যাওয়ার্ড’ জয় করে। উৎসবের জুরি বোর্ড এটিকে একটি ‘অত্যন্ত মৌলিক এবং নিপুণভাবে পর্যবেক্ষণকৃত চলচ্চিত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা দেখায় কীভাবে মানুষ, বিশেষ করে কোমলমতি শিশুরা, চরম অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের জন্য এক নতুন জীবনধারা তৈরি করে নেয়। গল্পের মূল চরিত্র নিকিতাকে তার বাবা-মা মেট্রো স্টেশন ছেড়ে বাইরে যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন, কারণ দিনের আলো সেখানে এখন প্রাণঘাতী বিপদের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রুদ্ধদ্বার পরিবেশে, যা কেবল কৃত্রিম নিয়ন বাতির আলোয় আলোকিত, নিকিতার সাথে ১১ বছর বয়সী ভিকার পরিচয় হয় এবং তাদের এই বন্ধুত্ব তাদের আবারও সূর্যের আলো অনুভব করার সাহস ও প্রেরণা জোগায়। পরিচালকগণ এই চলচ্চিত্রে ৮ মিলিমিটার ফিল্ম ব্যবহার করেছেন যাতে যুদ্ধের ট্র্যাজিক প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও দর্শকদের মনে একটি পারিবারিক আবহ এবং ইতিবাচক স্মৃতির উদ্রেক ঘটে।
চলচ্চিত্রটি ২২তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবং মানবাধিকার ফোরামে যুব জুরির পক্ষ থেকে সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছে। ‘ফটোফোবিয়া’র এই অভাবনীয় সাফল্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক অন্যান্য ইউক্রেনীয় যুদ্ধকালীন তথ্যচিত্রগুলোও বিশ্ববাসীর বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, মস্তিস্লাভ চেরনোভের ‘২০০০ মিটারস টু আন্দ্রিভকা’ চলচ্চিত্রটি এ বছর বাফটা (BAFTA) পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। এই ছবিটি ২০২৩ সালের গ্রীষ্মকালে বাখমুতের নিকটবর্তী আন্দ্রিভকা গ্রাম মুক্ত করার জন্য ৩য় অ্যাসল্ট ব্রিগেডের একটি প্লাটুনের দুঃসাহসিক অভিযানের চিত্র তুলে ধরে। চেরনোভ, যিনি ইতিপূর্বে তার ‘২০ ডেস ইন মারিউপোল’ কাজের জন্য অস্কার জয় করেছিলেন, ২০২৫ সালের সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি সিনেমা’ বিভাগে সেরা পরিচালনার পুরস্কার অর্জন করেছেন।
‘ফটোফোবিয়া’ সহ এই সমসাময়িক চলচ্চিত্রগুলো ইউক্রেনীয় জনগণের অদম্য সহনশীলতা ও সাহসিকতার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই কাজগুলো একদিকে যেমন মাটির নিচের আশ্রয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের কথা বলছে, অন্যদিকে সম্মুখ সমরের ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের বাস্তব চিত্রও বিশ্ববিবেকের সামনে উপস্থাপন করছে। এই চলচ্চিত্রগুলো কেবল যুদ্ধের নথিপত্র নয়, বরং চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের টিকে থাকার এবং স্বপ্ন দেখার এক অনন্য আখ্যান যা বিশ্বজুড়ে দর্শকদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করছে।



