এই সপ্তাহের শুরুতে পৃথিবীর বাসিন্দারা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী এবং অংশীদার হলেন। বেশ কয়েক দিনের অস্থিরতার পর আমাদের গ্রহের ম্যাগনেটোস্ফিয়ার অবশেষে শান্ত হয়েছে, যা ২০২৬ সালের প্রথম এবং অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সমাপ্তি চিহ্নিত করে। এই ঘটনাটি কেবল লক্ষ লক্ষ মানুষকে মেরুজ্যোতির এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য উপহার দেয়নি, বরং সৌর কার্যকলাপ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের প্রচলিত কিছু ধারণা নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে।
Aurora borealis from Italy - passo Giau Dolomiti d’Ampezzo - 19 gennaio 2026 Geomagnetic storm G5 Foto: @samuele.cecchetto_photography @astronomyexperience.axp Canon 6d Samyang 14mm f2.8 Bottone Treppiede
সবকিছুর শুরু হয়েছিল ১৮ জানুয়ারি, রবিবার, ইউটিসি (UTC) সময় ১৮:০৯ মিনিটে। সেই সময় সূর্যের বুকে 'এক্স১.৯' (X1.9) শ্রেণির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সৌর শিখা বা ফ্লেয়ার তৈরি হয়। এই বিস্ফোরণের উৎস ছিল সূর্যের সক্রিয় অঞ্চল ৪৩৪১, যা আগে সূর্যের উল্টো দিকে থাকা অবস্থায় দুটি বড় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। সূর্যের নিজস্ব ঘূর্ণনের সাথে সাথে এই অঞ্চলটি ঠিক পৃথিবীর মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। এই সরাসরি অবস্থানটি একটি শক্তিশালী আঘাতের পূর্বাভাস দিলেও, বাস্তব পরিস্থিতি বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশাকে অনেকগুণ ছাড়িয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের পর থেকে দেখা না যাওয়া এক নজিরবিহীন বিকিরণ ঝড়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পৃথিবীর আশেপাশে উচ্চ-শক্তির প্রোটন প্রবাহের ঘনত্ব প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে প্রতি সেকেন্ডে ৩৭,০০০ কণা স্পর্শ করে। এই সংখ্যাটি বিপজ্জনক 'লাল স্তর' থেকে হাজার গুণ বেশি এবং এটি ২০০১ সালের ৬ নভেম্বরের (৩১,৭০০ ইউনিট) এবং ২০০৩ সালের ২৯ অক্টোবরের (২৯,৫০০ ইউনিট) রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এটি ১৯৯১ সালের সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ৪৩,০০০ ইউনিটের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এই বিকিরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে এটি এসিই (ACE) মহাকাশযানের সেন্সরগুলোকে অকেজো করে দেয়, যার ফলে ধেয়ে আসা সৌর প্লাজমা মেঘের গতিবেগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পেতে বিজ্ঞানীরা সাময়িকভাবে বঞ্চিত হন।
২০-২১ জানুয়ারি শিখরে পৌঁছানো এই ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়টিকে ৫-পয়েন্ট স্কেলে 'জি৪.৭' (G4.7) বা 'শক্তিশালী' হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ বিভাগ 'জি৫' থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে ছিল। তবে এই ঝড়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল মেরুজ্যোতি বা অরোরা বোরিয়ালিসের অভূতপূর্ব ভৌগোলিক বিস্তৃতি। সাধারণত উচ্চ অক্ষাংশে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এবার এই আলোকছটা অনেক দক্ষিণে নেমে আসে। উত্তর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া এবং আলাবামার মতো ৩৫-৪০° অক্ষাংশে এটি দেখা গেছে। ইউরোপে দক্ষিণ ফ্রান্স ও উত্তর ইতালির ৪০-৪৫° অক্ষাংশ পর্যন্ত এবং এশিয়ায় ৪৫-৫০° সমান্তরাল রেখা পর্যন্ত এই উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি ছিল পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ারে নিক্ষিপ্ত বিশাল শক্তির সরাসরি ফলাফল।
প্রায় ৪২ ঘণ্টা স্থায়ী হওয়ার পর এই মহাজাগতিক ঘটনাটি এখন সমাপ্ত হয়েছে এবং প্লাজমা নির্গমনটি সৌরজগতের গভীরে চলে গেছে। তবে বিজ্ঞানীদের জন্য এখন শুরু হয়েছে দীর্ঘ বিশ্লেষণ পর্ব। তারা খতিয়ে দেখছেন কৃত্রিম উপগ্রহগুলো কী পরিমাণ বিকিরণের শিকার হয়েছে এবং কেন একটি সাধারণ 'এক্স' শ্রেণির শিখা থেকে এত শক্তিশালী প্রোটন ঝড় তৈরি হলো। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সূর্য বর্তমানে মাঝারি সক্রিয়তায় ফিরে আসছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এমন শক্তিশালী আঘাতের সম্ভাবনা কম। ২০২৬ সালের জানুয়ারির এই ঝড়টি ইতিমধ্যে বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে, যা মানবজাতিকে আমাদের নক্ষত্রের অসীম ক্ষমতা এবং মহাজাগতিক শক্তির সামনে আমাদের প্রযুক্তিগত সভ্যতার ভঙ্গুরতা সম্পর্কে আবারও সচেতন করে দিল।

