মহাকাশ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও হেলিওস্ফিয়ার মানচিত্রায়নে ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্ট L1-এ পৌঁছাল নাসার আইম্যাপ (IMAP) মহাকাশযান

সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.

নাসার (NASA) অত্যাধুনিক মহাকাশযান 'ইন্টারস্টেলার ম্যাপিং অ্যান্ড অ্যাক্সিলারেশন প্রোব' বা আইম্যাপ (IMAP) সফলভাবে তার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছে। পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী মহাকর্ষীয় ভারসাম্য বিন্দু ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্ট L1-এ এটি তার নির্দিষ্ট কক্ষপথ দখল করেছে। ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে এই অভিযানের সূচনা হয়েছিল। দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশে পাড়ি জমানোর পর, ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি আইম্যাপের L1 কক্ষপথে প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। মেরিল্যান্ডের লরেলে অবস্থিত জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরি (APL) এই পুরো যাত্রাপথটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। পৃথিবী থেকে সূর্যের দিকে প্রায় ১০ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থিত এই কৌশলগত অবস্থানটি মহাকাশ গবেষণার জন্য একটি আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।

আন্তঃতারা মানচিত্রণ ও ত্বরিত প্রোব (IMAP) আমাদের হিলিওস্ফিয়ার-এর মানচিত্র তৈরি করবে — আমাদের সৌরজগতকে ঘিরে থাকা বিশাল বুদবুদ।

L1 বিন্দুতে অবস্থানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে আইম্যাপ পৃথিবীর শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই মহাকাশের রহস্য উন্মোচন করতে পারবে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক ডেভিড ম্যাককোমাসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই মিশনটি নাসার 'সোলার টেরিস্ট্রিয়াল প্রোবস' কর্মসূচির পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর আগে টিআইএমইডি (TIMED), হিনোড (Hinode), স্টিরিও (STEREO) এবং এমএমএস (MMS)-এর মতো সফল মিশনগুলো এই কর্মসূচির অংশ ছিল। আইম্যাপ ইতিমধ্যেই তার বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা প্রদর্শন শুরু করেছে এবং এর দশটি অত্যাধুনিক যন্ত্র থেকে প্রাথমিক তথ্য বা 'ফার্স্ট লাইট' সংগ্রহ করা হয়েছে। এই বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামগুলোকে তিনটি বিশেষ শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এনার্জেটিক নিউট্রাল অ্যাটম ডিটেক্টর (IMAP-Lo, IMAP-Hi এবং IMAP-Ultra), চার্জড পার্টিকেল ডিটেক্টর (SWAPI, SWE, CoDICE এবং HIT) এবং মহাকাশের পরিবেশ পরিমাপের জন্য বিশেষ ম্যাগনেটোমিটার ও অন্যান্য যন্ত্র (MAG, IDEX, GLOWS)।

আইম্যাপের প্রধান বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য হলো মহাজাগতিক কণার ত্বরণ প্রক্রিয়া এবং সৌর বায়ুর সাথে আন্তঃনাক্ষত্রিক শূন্যস্থানের জটিল মিথস্ক্রিয়া বিশ্লেষণ করা। এই মহাকাশযানটি মূলত 'হেলিওস্ফিয়ার' নামক একটি বিশাল সুরক্ষাকবচ নিয়ে গবেষণা করবে। সূর্য থেকে নির্গত এই বিশাল বুদবুদটি আমাদের পুরো সৌরজগতকে ক্ষতিকর গ্যালাকটিক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। L1 অবস্থানে থাকার কারণে আইম্যাপ পৃথিবীর জন্য একটি আগাম সতর্কবার্তা কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করবে। এর 'আই-অ্যালার্ট' (I-ALiRT) বা আইম্যাপ অ্যাক্টিভ লিঙ্ক ফর রিয়েল-টাইম সিস্টেমের মাধ্যমে বিপজ্জনক সৌর ঝড় আসার প্রায় ৩০ মিনিট আগেই সংকেত পাঠানো সম্ভব হবে। এই ব্যবস্থাটি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে তথ্য সরবরাহ করবে, যা পৃথিবীর বিদ্যুৎ গ্রিড, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং গভীর মহাকাশে থাকা নভোচারীদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আইম্যাপের আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা মূলত হেলিওফিজিক্স এবং হেলিওস্ফিয়ারের সীমানার একটি নিখুঁত মানচিত্র তৈরির ওপর কাজ করবেন। আইম্যাপের সংগৃহীত তথ্যগুলো নাসার অন্যান্য মিশন যেমন উইন্ড (Wind), এসিই (ACE) এবং ইএসএ ও নাসার যৌথ উদ্যোগ সোহো (SOHO)-এর ডেটার সাথে সমন্বয় করা হবে। এর আগে আইবেক্স (IBEX) মিশনটি পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে কাজ করলেও, আইম্যাপ পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে আরও সরাসরি এবং নির্ভুলভাবে সৌর কণা পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। জনস হপকিন্স এপিএল (APL) এই মিশনের সার্বিক পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করছে, অন্যদিকে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এই পুরো কর্মসূচির তদারকি করছে যাতে বিজ্ঞানীদের কাছে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

6 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Global Science

  • NASA's IMAP Mission Reaches Its Destination

  • NASA IMAP reaches Sun-Earth Lagrange point for heliosphere studies - primetimer.com

  • NASA's IMAP Reaches Orbit to Start Study of Heliosphere and Space Weather

  • NASA launches mission to study sun-fueled bubble that protects our solar system - JHU Hub

  • The IMAP launch is scheduled for September 2025 - GLOWS

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।