বর্তমান সময়ে আমাদের পৃথিবী এক অভাবনীয় মহাজাগতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের ০২:০০ ইউটিসি (UTC) পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটি অন্যতম শক্তিশালী সৌর ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সূর্যের একটি বিশাল বিস্ফোরণের ঠিক এক দিন পরেই করোনাল মাস ইজেকশন বা সিএমই সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। এর ফলে দুটি বিরল এবং চরম ঘটনা একই সাথে ঘটছে: ২০০৩ সালের পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী এস৪ (S4) পর্যায়ের সৌর বিকিরণ ঝড় এবং ৫-পয়েন্ট স্কেলে জি৪.৩৩ (G4.33) মাত্রার একটি চরম ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় পৃথিবীকে আঘাত করেছে।
An S4 severe solar radiation storm is now in progress - this is the largest solar radiation storm in over 20 years. The last time S4 levels were observed was in October, 2003. Potential effects are mainly limited to space launch, aviation, and satellite operations.
এই মহাজাগতিক তাণ্ডবের শুরু হয়েছিল উচ্চ-শক্তির প্রোটন প্রবাহের তীব্র বৃদ্ধির মাধ্যমে, যা ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ইউটিসি সময় অনুযায়ী সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ১০ এমইভি (10 MeV)-এর বেশি শক্তি সম্পন্ন কণার প্রবাহ অবিশ্বাস্যভাবে ৩৭,০০০ ইউনিটে উন্নীত হয়। এই সংখ্যাটি ২০০৩ সালের বিখ্যাত হ্যালোইন সৌর শিখার রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে এবং একবিংশ শতাব্দীতে এখন পর্যন্ত এটি একটি নতুন রেকর্ড হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই অভাবনীয় বৃদ্ধির ফলে এস৪ পর্যায়ের বিকিরণ ঝড় শুরু হয়, যা গত দুটি সৌর চক্রের মধ্যে প্রথমবার দেখা গেল। এই ধরনের বিকিরণ পরিস্থিতি মহাকাশযান পরিচালনা, মেরু অঞ্চলের বিমান চলাচল এবং উচ্চ-অক্ষাংশের রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি ও বিঘ্ন তৈরি করতে পারে।
ঘটনার চূড়ান্ত পর্যায়টি আসে যখন শকওয়েভ এবং প্লাজমা মেঘের মূল অংশ পৃথিবীর চৌম্বক মণ্ডলে সরাসরি আঘাত হানে। ১৯ জানুয়ারি প্রায় ১৯:৪৮ ইউটিসি সময়ে এই সংঘর্ষটি ঘটে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, প্লাজমা মেঘটি মহাকাশের শেষ ১.৫ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ মাত্র ১৫ মিনিটে পাড়ি দিয়েছে, যার অর্থ এর গতি ছিল সেকেন্ডে প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার। এই আঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি এসিই (ACE) নামক গুরুত্বপূর্ণ মনিটরিং স্যাটেলাইটের গতি পরিমাপক সেন্সরগুলোকে সাময়িকভাবে অকেজো করে দেয়। শকওয়েভ থেকে উৎপন্ন তড়িৎচৌম্বকীয় পালস আন্তঃগ্রহ চৌম্বক ক্ষেত্রের মানকে অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে বিটি (Bt) ৮৭ এনটি এবং বিজেড (Bz) -৩২ এনটি রেকর্ড করা হয়। পরবর্তীতে এই ক্ষেত্রটি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বিটি ~৩৫ এনটি এবং বিজেড -২৩ এনটি-তে অবস্থান করছে, যা অত্যন্ত শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় বজায় রেখেছে।
HP30 values of 10 reached during the first 3 hours of the impact. A Kp index of 9 = a G5 storm. If/the moment this solar storm magnetic field flips negative, we're in for some absolute MADNESS
২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জি৪.৩৩ মাত্রার একটি বৈশ্বিক চৌম্বক ঝড় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ পর্যায় জি৫ (G5) থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে। পটসডাম সেন্টার, যারা বৈশ্বিক সূচক গণনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে, তারা এই মানটি নিশ্চিত করেছে। তবে বিভিন্ন স্থানীয় স্টেশনে আরও বেশি মাত্রার অস্থিরতা ধরা পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে অনন্য দিক হলো এস৪ বিকিরণ ঝড় এবং জি৪.৩৩ ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় একই সাথে পৃথিবীকে আঘাত করছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের দুটি শক্তিশালী ঘটনার সহাবস্থান ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এবং এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি করছে।
এই সৌর ঝড়ের প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়া, কানাডা এবং এমনকি ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং গতিশীল মেরুজ্যোতি বা অরোরা দেখা গেছে। এমনকি মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও এই আলোর ছটা দেখার খবর পাওয়া গেছে। যদিও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির ওপর বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সংশ্লিষ্ট অপারেটররা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তবুও পাওয়ার গ্রিডগুলোর ওপর চাপের মাত্রা এখনও অনেক বেশি। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এখন চব্বিশ ঘণ্টা এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই ঝড় কি জি৫ মাত্রা অতিক্রম করে ২০০৩ বা ২০২৪ সালের মতো কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার জন্ম দেবে কি না। আগামী কয়েক ঘণ্টা এই মহাজাগতিক পরিস্থিতির চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
