সিমুলেশন হাইপোথিসিস: তথ্য তত্ত্ব বনাম গণনামূলক সীমাবদ্ধতা

সম্পাদনা করেছেন: Irena I

কম্পিউটার সিমুলেশন দ্বারা সৃষ্ট জগৎ—এই ধারণা, যা ১৯৯৯ সালের চলচ্চিত্র 'দ্য ম্যাট্রিক্স' দ্বারা জনপ্রিয়তা লাভ করে, বর্তমানে বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই চলমান অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তথ্য তত্ত্বের ভিত্তিতে উত্থাপিত নতুন প্রমাণ এবং গণনামূলক অসম্ভবতার উপর ভিত্তি করে উত্থাপিত পাল্টা যুক্তিগুলির মধ্যেকার সংঘাত। এই বিতর্কটি দার্শনিক গভীরতা এবং অত্যাধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করে, যা আমাদের বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এই অনুসন্ধানের আলোচনা মূলত নিক বোস্ট্রমের ২০০৩ সালের সম্ভাব্যতা যুক্তির ওপর ভিত্তি করে শুরু হলেও, সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি, বিশেষত ২০২২, ২০২৩ এবং ২০২৫ সালের প্রথম দিকের কাজগুলি, নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই গবেষণায় পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাজ্য), বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইতালি) এবং লুইসভিল বিশ্ববিদ্যালয় (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)-এর গবেষকরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলির বিজ্ঞানীরা মেলভিন ভপসন এবং ফ্রাঙ্কো ভাজ্জার মতো ব্যক্তিত্বদের কাজের মাধ্যমে বিতর্কের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছেন।

পদার্থবিজ্ঞানী মেলভিন ভপসন তাঁর 'সেকেন্ড ল অফ ইনফোডাইনামিক্স' (Second Law of Infodynamics) প্রস্তাব করেছেন, যা তথ্যকে একটি ভৌত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে এবং মহাবিশ্বের তথ্যগত জটিলতা হ্রাস করার প্রবণতাকে নির্দেশ করে। ভপসন যুক্তি দেন যে মহাকর্ষ সম্ভবত তথ্য অপ্টিমাইজেশনের একটি উদ্ভূত প্রভাব, যা ডিজিটাল পদার্থবিজ্ঞানের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে মহাবিশ্বের বিবর্তন ডেটা সংকোচনের মতো কাজ করে। ভপসন পূর্বেও গবেষণা করেছেন যে তথ্য ভৌত ভর বহন করতে পারে এবং মৌলিক কণাগুলি ডিএনএ-এর মতো তথ্য সংরক্ষণ করে।

অন্যদিকে, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কো ভাজ্জা গণনামূলক অসম্ভবতার ভিত্তিতে সিমুলেশন তত্ত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। ভাজ্জার গণনা অনুসারে, মহাবিশ্বকে প্ল্যাঙ্ক স্কেল পর্যন্ত সিমুলেট করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণ মহাবিশ্বের নিজস্ব শক্তির চেয়েও বেশি হবে, যা এটিকে কার্যত অসম্ভব করে তোলে। তিনি দেখিয়েছেন যে, এমনকি পৃথিবীর মতো একটি গ্রহকে প্ল্যাঙ্ক স্কেল রেজোলিউশনে সিমুলেট করতে গেলে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সমস্ত ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করার সমতুল্য শক্তির প্রয়োজন হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, যদি সিমুলেটররা আমাদের মতোই পদার্থবিদ্যা মেনে চলে, তবে সিমুলেশন তৈরি করা অসম্ভব।

ভপসনের ইনফোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র, যা তথ্য এনট্রপির হ্রাসকে নির্দেশ করে, একটি নতুন তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করে, যা পূর্বে ভৌত এনট্রপির বৃদ্ধির ধারণার বিপরীত। ভপসন ২০২২ সালে তাঁর এই নতুন সূত্রটি প্রস্তাব করেন, যা জেনেটিক মিউটেশন ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম এবং প্রমাণ করে যে তথ্যগত বিশৃঙ্খলা সময়ের সাথে সাথে হ্রাস পায়। এর বিপরীতে, ভাজ্জার সমালোচনা বর্তমান ভৌত আইনের উপর ভিত্তি করে একটি পরিমাণযোগ্য চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে। তিনি মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ সিমুলেশন, কেবল পৃথিবীর সিমুলেশন, অথবা নিউট্রিনো দ্বারা চিহ্নিত একটি নিম্ন-রেজোলিউশনের পৃথিবীর সিমুলেশন—এই তিনটি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে প্রয়োজনীয় শক্তি জ্যোতির্বিজ্ঞানের দিক থেকে বিশাল।

এই বিতর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ; নিক বোস্ট্রম ২০০৩ সালে তাঁর বিখ্যাত যুক্তি প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি বলেন যে হয় মানব প্রজাতি বিলুপ্ত হবে, অথবা পোস্টহিউম্যান সভ্যতাগুলি সিমুলেশন চালাতে আগ্রহী হবে না, অথবা আমরা প্রায় নিশ্চিতভাবেই একটি সিমুলেশনে বাস করছি। ইলন মাস্ক মাঝে মাঝে এই ধারণাকে সমর্থন করেছেন। এই আলোচনাগুলি প্রমাণ করে যে সিমুলেশন হাইপোথিসিস কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং এটি পদার্থবিজ্ঞান, তথ্য তত্ত্ব এবং দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছেদবিন্দুতে অবস্থান করছে, যা আমাদের বাস্তবতার মৌলিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

21 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • New Scientist

  • IAI TV

  • Frontiers in Physics

  • Popular Mechanics

  • Lincoln Cannon

  • MDPI

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?

আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।