গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে যাওয়ার গতি বৃদ্ধি: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও সামুদ্রিক স্রোত নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সম্পাদনা করেছেন: Tetiana Martynovska 17

২০২৬ সালের শুরুর দিকে গ্রিনল্যান্ডের বরফ স্তর, যা অ্যান্টার্কটিকার বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম বরফের আধার, এক নজিরবিহীন এবং ধারাবাহিক ক্ষয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। এই বিশাল বরফ খণ্ডটি বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কোপার্নিকাস সেন্টিনেল-২ (Copernicus Sentinel-2) মিশনের সাম্প্রতিক উচ্চ-রেজোলিউশন স্যাটেলাইট চিত্রগুলো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় হেলহেইম হিমবাহের (Helheim Glacier) খাড়া বরফ প্রাচীরগুলোর ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। এই হিমবাহটি মহাসাগরে বরফ নির্গমনের একটি প্রধান পথ হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রিনল্যান্ড থেকে প্রতি ৩৬০ গিগাটন বরফ গলে যাওয়ার অর্থ হলো বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিলিমিটার বৃদ্ধি পাওয়া, যা উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।

অতীতের জলবায়ু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দ্রুত বরফ গলে যাওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে। গ্রিনড্রিল প্রজেক্টের (GreenDrill Project) গবেষকরা উত্তর-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের প্রুডো ডোমে (Prudhoe Dome) ৫০০ মিটারেরও বেশি গভীরতায় বরফ খনন করে প্রায় ৭,১০০ বছর আগের পলিমাটিতে রাসায়নিক চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন। এই তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, হোলোসিন উষ্ণ যুগে (Holocene warm period) এই ডোমটি সম্পূর্ণভাবে গলে গিয়েছিল। সেই সময়ে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা বর্তমানের তুলনায় ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। বর্তমান গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ধারা অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে জলবায়ু মডেলগুলো একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির পূর্বাভাস দিচ্ছে। এই ঐতিহাসিক তথ্যটি সামান্য উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বরফ স্তরের শারীরিক সংবেদনশীলতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদান করে।

পৃষ্ঠতলের বরফ গলার পাশাপাশি মাটির নিচের ভূতাত্ত্বিক কারণগুলোও এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Ottawa) একটি দলের নেতৃত্বে তৈরি করা বিস্তারিত ত্রিমাত্রিক মডেলে দেখা গেছে যে, গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে অসমভাবে তাপ আটকা পড়ে আছে। এটি মূলত গ্রিনল্যান্ডের প্রাচীন টেকটোনিক চলনের ফলে সৃষ্ট আইসল্যান্ড হটস্পটের (Iceland hotspot) প্রভাব। প্রায় ৮০ থেকে ৩৫ মিলিয়ন বছর আগে টেকটোনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই ভূ-তাপীয় অসঙ্গতি গ্রিনল্যান্ডের এক-চতুর্থাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই তাপ বরফের গভীর স্তরকে পাতলা করে দিয়েছে এবং তলদেশে প্রচুর পরিমাণে গলিত জল তৈরি করেছে, যা হিমবাহের পিচ্ছিলতা বাড়িয়ে দিয়ে বরফ স্তরের প্রবাহের গতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে।

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে এই বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জলের প্রবেশ আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন (AMOC) বা সামুদ্রিক তাপ পরিবহন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের কাছে ঘন গভীর জলরাশি তলিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এই স্রোতটি পরিচালিত হয়, যা ব্যাহত হলে উত্তর গোলার্ধের জলবায়ু ও আঞ্চলিক আবহাওয়ার ধরণ আমূল বদলে যেতে পারে। ইউনিভার্সিটি অফ লিজ-এর (University of Liège) সমন্বয়ে এবং NIC5 সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে করা গবেষণায় দেখা গেছে যে, উচ্চ নির্গমন পরিস্থিতিতে (SSP585) ২১০০ সাল নাগাদ গ্রিনল্যান্ড প্রতি বছর ৯৬৪ থেকে ১,৭৩৫ গিগাটন বরফ হারাতে পারে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডেনমার্কের চারটি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ পোলার পোর্টালের (Polar Portal) মতো সংস্থাগুলো বর্তমানে এই চলমান প্রক্রিয়াটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

15 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • MoneyControl

  • Live Science

  • Geographical Magazine

  • Japan Today

  • Anadolu Agency

  • Space.com

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।