শীতটি পুরো শক্তিসহ ফিরে এসেছে।
১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্য ইউরোপ বর্তমানে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং কঠোর শীতকালীন আবহাওয়ার কবলে রয়েছে। এই অঞ্চলজুড়ে নিয়মিত তুষারপাত এবং ভোরের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে হিমাঙ্কের নিচে অবস্থান করছে, যা জনজীবনকে স্থবির করে তুলেছে। সপ্তাহের শুরুতে সোমবার সকালে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রথম তুষারপাত শুরু হয় এবং দিন বাড়ার সাথে সাথে তা উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বিভিন্ন জনপদে তুষারের সঞ্চয় সাধারণত এক থেকে তিন সেন্টিমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সকালের দিকে মাঝারি থেকে তীব্র কুয়াশা ও তুষারপাত পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাইনাস ৪ থেকে মাইনাস ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রেকর্ড করা হয়েছে। দিনের বেলা সূর্যের দেখা মিললেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হিমাঙ্কের খুব একটা উপরে উঠতে সক্ষম হয়নি।
বছরের সেই সংক্ষিপ্ত জাদুকরী সময়টি যখন আলপাইন হ্রদগুলো মৌসুমের জন্য বরফে জমে যায় (এবং নিরাপদভাবে স্কেট করার জন্য যথেষ্ট মোটা)।
ইউরোপীয় বায়ুমণ্ডলের এই চলমান অস্থিরতা মূলত একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক পরিস্থিতির অংশ, যা জানুয়ারির শেষের দিকে শুরু হওয়া 'সাডেন স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক ওয়ার্মিং' (SSW) নামক একটি বিরল ঘটনার সাথে সরাসরি যুক্ত। এই প্রাকৃতিক ঘটনার প্রভাবে মেরু ঘূর্ণাবর্ত বা পোলার ভর্টেক্স খণ্ডিত হয়ে পড়েছে, যার ফলে পুরো মহাদেশজুড়ে আবহাওয়ার খামখেয়ালি আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে মঙ্গলবার রাতের পূর্বাভাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সেক্টরগুলোতে বরফ জমার তীব্র ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছে। সেখানে মাঝে মাঝে তুষারপাত বা হিমশীতল বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে এবং রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাইনাস ২ থেকে মাইনাস ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে মঙ্গলবার দিনের বেলা তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যদিও রাতের বেলা তা আবার দ্রুত হ্রাস পাবে।
ট্রপোস্ফিয়ারিক জেট স্ট্রিমের এই বিশেষ বিন্যাস দক্ষিণ ইউরোপের গড় তাপমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ অবস্থার ঠিক বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। জার্মানি এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে অনুভূত এই দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ মূলত একটি বৃহত্তর আবহাওয়াগত প্যাটার্নের অংশ। উত্তর ইউরোপের ওপর একটি উচ্চচাপ বলয় এবং ব্লকড ওয়েদার সিস্টেমের প্রভাবে মহাদেশের কিছু অংশ ২০১০ সালের পর তাদের শীতলতম জানুয়ারি মাস অতিবাহিত করেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে মেরু অঞ্চলের শীতল বাতাস মহাদেশের বিশাল অংশে আটকা পড়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, গত ১ ফেব্রুয়ারি লিথুয়ানিয়ায় তাপমাত্রা মাইনাস ৩৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল এবং উত্তর-পূর্ব পোল্যান্ডে মাইনাস ২৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের এই বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতিকে বিভিন্ন বায়ুস্তরের একটি সংঘর্ষ বিন্দু হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। আগামী ১২ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে উত্তর থেকে আসা একটি উল্লেখযোগ্য শীতল বায়ুপ্রবাহ দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দীর্ঘস্থায়ী শীত কেবল যাতায়াত ও পরিবহণ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে না, বরং এটি ইউরোপের জ্বালানি বাজারের ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। ঘরবাড়ি গরম রাখার জন্য হিটিং সিস্টেমের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর পাশাপাশি কৃষি খাতও এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন। সময়ের আগে বসন্তের আগমনে অনেক গাছে কুঁড়ি চলে এসেছিল, কিন্তু বর্তমানের এই আকস্মিক তুষারপাত সেই প্রাথমিক বৃদ্ধিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম পোল্যান্ড এবং পূর্ব জার্মানিতে তুষারের পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক স্তর না থাকায় গম এবং রেপসিডের মতো শীতকালীন ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউক্রেনের মতো দেশগুলোতে, যেখানে ফসলের টিকে থাকার জন্য নির্দিষ্ট হিমাঙ্ক সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ১০-১৫ সেন্টিমিটার তুষারের সুরক্ষামূলক স্তর ছাড়াই তাপমাত্রা মাইনাস ১৪ থেকে মাইনাস ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ায় শীতকালীন বার্লি এবং রেপসিড চাষের জন্য এটি একটি সংকটময় মুহূর্ত তৈরি করেছে। এই সামগ্রিক আবহাওয়া পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানীরা 'কয়েলড স্প্রিং' বা সংকুচিত স্প্রিং প্রভাবের সাথে তুলনা করছেন। উত্তর কানাডার ওপর উচ্চচাপের বাধার ফলে বায়ুমণ্ডল সংকুচিত হচ্ছে, যা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত আর্কটিক বাতাসকে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবাহিত করতে পারে। মহাদেশজুড়ে বিদ্যমান এই জটিলতা বায়ুমণ্ডলীয় বিভাজনের চরম স্থানীয় এবং বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।