পোপোক্যাটেপেটলের আকাশে রহস্যময় আলোকস্তম্ভ: বিজ্ঞান না কি ভিনগ্রহী সংকেত?

লেখক: Uliana S.

20 января 2026 года মেক্সিকান আগ্নেয়গিরি Popocatépetl-এর নজরদারি ক্যামেরাগুলো আলোর স্তম্ভগুলি নথিবদ্ধ করেছে

২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি ভোরের দিকে মেক্সিকোর বিখ্যাত পোপোক্যাটেপেটল আগ্নেয়গিরির ওপর এক অভাবনীয় ও রহস্যময় দৃশ্য ধরা পড়ে। আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণকারী ক্যামেরায় ধরা পড়া এই ফুটেজে দেখা যায়, জ্বালামুখ থেকে বেশ কিছু উজ্জ্বল ও উল্লম্ব আলোকস্তম্ভ সরাসরি আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিজ্ঞানী, আবহাওয়াবিদ এবং মহাকাশ গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। যদিও সাধারণ চোখে এটি অত্যন্ত রহস্যময় মনে হতে পারে, বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে বিভিন্ন যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, যদিও একদল মানুষ এর পেছনে ভিনগ্রহী প্রাণীদের হাত রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন।

পোপোক্যাটেপেটল হলো ৫,৪২৬ মিটার উচ্চতার একটি বিশাল স্ট্র্যাটোভলকানো, যা মেক্সিকো সিটি থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রাচীন নাহুয়াতল ভাষায় এই আগ্নেয়গিরির নামের অর্থ হলো 'ধূম্রায়মান পাহাড়', যা এর প্রকৃতির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি নিয়মিতভাবে ছাই, গ্যাস এবং উত্তপ্ত শিলাখণ্ড নির্গত করার জন্য পরিচিত। মেক্সিকোর ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজাস্টার প্রিভেনশন (CENAPRED)-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম দিকে আগ্নেয়গিরিটি মাঝারি মাত্রায় সক্রিয় ছিল। এই সময়ে প্রতিদিন বেশ কয়েকটি ছোটখাটো বিস্ফোরণ এবং আকাশসীমায় ৬,১০০ মিটার পর্যন্ত ছাইয়ের কুণ্ডলী লক্ষ্য করা গিয়েছিল, যা আগ্নেয়-টেকটোনিক ভূমিকম্পের সাথে সম্পর্কিত ছিল।

২০ জানুয়ারির সেই বিশেষ দিনটিতেও আগ্নেয়গিরির পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল এবং সতর্কবার্তা হিসেবে 'হলুদ সংকেত' বা ইয়েলো অ্যালার্ট জারি ছিল। এই সতর্কবার্তার অর্থ হলো আশেপাশের জনপদে ছাই বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে এবং সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। তবে সেই মধ্যরাতে ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই আলোক রশ্মিগুলো সাধারণ অগ্নুৎপাতের কোনো লক্ষণের সাথে মিলছিল না, যা জনমনে কৌতূহল ও কিছুটা ভয়ের সৃষ্টি করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, স্থানীয় সময় প্রায় মধ্যরাতের দিকে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে উজ্জ্বল উল্লম্ব আলোক রশ্মিগুলো নির্গত হচ্ছে। এই আলোগুলো স্থির ছিল না; বরং সেগুলো কাঁপছিল, কখনও দীর্ঘ হচ্ছিল আবার কখনও মিলিয়ে যাচ্ছিল। এই দৃশ্যটি অনেকটা বৈদ্যুতিক ডিসচার্জ বা মেরুজ্যোতির মতো মনে হচ্ছিল। নেটিজেনরা এই ঘটনার প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব আলোচনা করছেন, যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য তত্ত্ব হলো 'রেড স্প্রাইটস'। এটি বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ঘটা এক অত্যন্ত বিরল আলোকীয় ঘটনা যা সাধারণত বজ্রপাতের সাথে সম্পর্কিত।

এই রহস্যময় ঘটনার সময়কালটি কাকতালীয়ভাবে ১৯ জানুয়ারি পৃথিবীতে আঘাত হানা একটি শক্তিশালী G4 মাত্রার ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সাথে মিলে যায়। সূর্যের একটি X1.9 ক্লাসের শক্তিশালী শিখা থেকে নির্গত করোনাল মাস ইজেকশন (CME) এই ঝড়ের মূল কারণ ছিল। এই ধরনের শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন ধরনের আলোকীয় প্রভাব তৈরি করতে পারে। এর ফলে মেসোস্ফিয়ারে, অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫০ থেকে ৯০ কিলোমিটার উচ্চতায় ক্ষণস্থায়ী উজ্জ্বল আলোক শিখা বা 'স্প্রাইটস' তৈরি হওয়া সম্ভব। পোপোক্যাটেপেটলের ছাই মেঘে প্রায়ই শক্তিশালী বজ্রপাত হয়, যা এই ধরনের বৈদ্যুতিক ঘটনা ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিজ্ঞানীদের দেওয়া আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো 'লাইট পিলার' বা আলোকস্তম্ভের অপটিক্যাল প্রভাব। যখন বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে বরফের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফটিক ভাসমান অবস্থায় থাকে, তখন তারা ভূপৃষ্ঠের কোনো উজ্জ্বল আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে প্রতিফলিত করে একটি স্তম্ভের মতো আকৃতি তৈরি করে। এক্ষেত্রে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের ভেতরে থাকা উত্তপ্ত লাভার উজ্জ্বল আভা সেই আলোর উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী মন্তব্য করেছেন যে, এটি একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা যা সাধারণত অত্যন্ত শীতল অঞ্চলে দেখা যায়। তবে আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত গ্যাস এবং সৌর সক্রিয়তার সংমিশ্রণ মেক্সিকোর এই অঞ্চলেও এমন দৃশ্য তৈরি করতে পারে।

তবে সব ব্যাখ্যাই বিজ্ঞানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিশেষ করে যখন বিষয়টি পোপোক্যাটেপেটল আগ্নেয়গিরিকে নিয়ে। এই আগ্নেয়গিরিটি দীর্ঘকাল ধরেই বিভিন্ন অমীমাংসিত এবং অতিপ্রাকৃত ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। অদ্ভুত আলোর নাচানাচি, 'বিস্ফোরিত গোলক' থেকে শুরু করে জ্বালামুখের ভেতরে ইউএফও (UFO) প্রবেশ করার অসংখ্য খবর বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। কিছু ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাবি করছেন যে, এই আগ্নেয়গিরিটি আসলে 'গ্যালাকটিক ফেডারেশন'-এর একটি গোপন ঘাঁটি। তাদের মতে, এই আলোকস্তম্ভগুলো আসলে ভিনগ্রহী শক্তি থেকে আসা বিশেষ 'ফ্রিকোয়েন্সি' বা সংকেত, যা অন্য কোনো মাত্রা থেকে আসছে।

এই ধরনের জল্পনা-কল্পনার মূলে রয়েছে মেক্সিকোর গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। প্রাচীন অ্যাজটেক উপকথা অনুযায়ী, পোপোক্যাটেপেটল এবং এর পাশের ইজটাকসিহুয়াতল পাহাড় হলো দেবতা এবং পবিত্র আত্মাদের আবাসস্থল। স্থানীয় সংস্কৃতিতে এই পাহাড়গুলোকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে করা আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরীণ অংশের প্রথম থ্রি-ডি (3D) ইমেজিংয়ে শুধুমাত্র একটি জটিল ম্যাগমা সিস্টেমের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, তবুও কোনো গোপন 'বেস' বা ভিনগ্রহী ঘাঁটির প্রমাণ মেলেনি।

তা সত্ত্বেও, এই আগ্নেয়গিরিকে ঘিরে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা বিভিন্ন অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষ এবং গবেষকদের আগ্রহকে সবসময় জিইয়ে রেখেছে। বিজ্ঞানের এই চরম উন্নতির যুগেও প্রকৃতির এমন কিছু রহস্যময় রূপ আমাদের সামনে আসে যা আমাদের প্রচলিত জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ জানায়। পোপোক্যাটেপেটলের এই আলোকস্তম্ভগুলো সেই বিস্ময়েরই একটি অংশ, যা একই সাথে বৈজ্ঞানিক কৌতূহল এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এক অদ্ভুত মিশেল তৈরি করেছে।

পরিশেষে, CENAPRED তাদের ২০ জানুয়ারির দাপ্তরিক রিপোর্টে কোনো বিশেষ অস্বাভাবিকতার কথা উল্লেখ করেনি। তারা মূলত আগ্নেয়গিরির সাধারণ অগ্নুৎপাত এবং ছাই নির্গমনের ওপরই তাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ রেখেছিল। বিজ্ঞানীদের কাছে এই ঘটনাটি মহাকাশ এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্যকার জটিল মিথস্ক্রিয়া অধ্যয়নের একটি নতুন সুযোগ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এটি প্রকৃতির অসীম ক্ষমতার এক স্মারক। এই ফেনোমেননটি আবারও প্রমাণ করল যে, পোপোক্যাটেপেটলের মতো স্থানগুলোতে কীভাবে বিজ্ঞান এবং লোককথা একে অপরের সাথে মিলেমিশে এক রহস্যময় আখ্যান তৈরি করে।

25 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।