হার্ভার্ড থেকে একজন সাবেক পদার্থবিজ্ঞানী, ড. মাইকেল গিলেন, দাবি করেন যে স্বর্গ (এবং ঈশ্বরের চিরন্তন রাজ্য) ব্রহ্মাণ্ডীয় দিগন্তের বাইরে থাকতে পারে।
মহাজাগতিক দিগন্তে কি ঈশ্বরের বাস? পদার্থবিজ্ঞানী গুইলেনের নতুন এক চাঞ্চল্যকর হাইপোথিসিস
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে ডক্টরেটধারী তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ডক্টর মাইকেল গুইলেন মহাবিশ্বে ঐশ্বরিক সত্তার সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে একটি চমকপ্রদ তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, স্রষ্টার আবাসস্থল বা স্বর্গ মহাজাগতিক দিগন্তে (cosmological horizon) অবস্থিত হতে পারে। গুইলেনের হিসাব অনুযায়ী, এই স্থানটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭৩ সেক্সটিলিয়ন মাইল বা ৪৩৯ সেক্সটিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তিনি আধুনিক মহাজাগতিক বিজ্ঞান এবং ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসের এক অনন্য সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেছেন।
এই হাইপোথিসিসের মূলে রয়েছে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের কিছু মৌলিক আবিষ্কার। ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল প্রমাণ করেছিলেন যে মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে যে গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে তা তাদের দূরত্বের সমানুপাতিক, যা 'হাবল সূত্র' নামে পরিচিত। মহাজাগতিক দিগন্ত হলো এমন এক সীমা যেখানে বস্তুগুলোর দূরে সরে যাওয়ার গতি আলোর গতির (প্রতি সেকেন্ডে ১৮৬,০০০ মাইল) সমান হয়ে যায়। ফলে সেই সীমানা থেকে কোনো আলো আর পর্যবেক্ষকের কাছে পৌঁছাতে পারে না।
আলবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো ভৌত বস্তুর পক্ষে এই সীমা অতিক্রম করা অসম্ভব। ডক্টর গুইলেন এই দুর্ভেদ্য সীমানাকে বাইবেলে বর্ণিত ঈশ্বরের রাজ্যের 'অনন্ত' এবং 'কালজয়ী' বৈশিষ্ট্যের সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর ধারণা, এই দিগন্তের ওপারে পদার্থসমূহ এক বিশেষ 'সময়হীন' বৈশিষ্ট্য লাভ করে, যেখানে অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনো অস্তিত্ব নেই, অথচ স্থান বা স্পেস বিদ্যমান থাকে। এটি মূলত স্বর্গের সেই আধ্যাত্মিক বর্ণনার সাথে মিলে যায় যেখানে সময়ের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
ডক্টর গুইলেন আরও প্রস্তাব করেছেন যে, এই দিগন্তের ওপারে এক অদৃশ্য মহাবিশ্ব রয়েছে যা আলোর মতো সত্তা দ্বারা পূর্ণ। এই ধারণাটি 'হলো গ্রাফিক প্রিন্সিপাল' বা হলোগ্রাফিক নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতের সমস্ত তথ্য একটি দ্বিমাত্রিক তলে সংরক্ষিত থাকে। উল্লেখ্য যে, ডক্টর গুইলেন একসময় নাস্তিক ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। তাঁর এই আধ্যাত্মিক রূপান্তরের কথা তিনি 'বিলিভিং ইজ সিয়িং' (Believing is Seeing) নামক গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, যা তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণার পেছনে ধর্মীয় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
তবে বিজ্ঞানী মহলে এই তত্ত্বটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। সমালোচকদের মতে, দৃষ্টিলব্ধ সীমা এবং ভৌত সীমার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তাঁরা দাবি করেন যে, মহাজাগতিক দিগন্ত মূলত পর্যবেক্ষকের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল একটি ধারণা। এর তথাকথিত 'সময়হীনতা' আসলে মহাবিশ্বের প্রসারণ এবং রেডশিফ্ট বা লোহিত বিচ্যুতিজনিত একটি আলোক বিভ্রম মাত্র, কোনো ধ্রুব ভৌত বাধা নয়। সাধারণত মহাজাগতিক এই দিগন্ত সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৮১ সালে অ্যালান গুথ 'ইনফ্লেশন থিওরি' বা স্ফীতি তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন, যা গুইলেনের অনুমানমূলক ব্যাখ্যার চেয়ে ভিন্ন।
যদিও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণে হাবল ধ্রুবক ব্যবহার করে (যা বিভিন্ন হিসাবে ৬ থেকে ২৫ বিলিয়ন বছর হতে পারে), গুইলেন এই বৈজ্ঞানিক পরিমাপকে একটি আধিভৌতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গার বাইরে গ্যালাক্সির অস্তিত্ব প্রমাণকারী এডউইন হাবল নিজে কোনো ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন না এবং তাঁর কাজে কখনোই বাইবেলের প্রভাব ছিল না। গুইলেনের এই হাইপোথিসিস অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞান এবং ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের মধ্যকার চিরন্তন বিতর্ককে আবারও নতুন করে উসকে দিয়েছে।
উৎসসমূহ
Sciencepost
Times of India
UNILAD
The Guardian
IFLScience
The Economic Times
