ওকলাহোমার নরমান আকাশে বিরল ‘রেড স্প্রাইট’ বা লাল আভা প্রত্যক্ষ: বজ্রঝড়ের পর এক অপার্থিব দৃশ্য

সম্পাদনা করেছেন: Uliana Soloveva

২০২৬ সালের ১১ মার্চ, বুধবার রাতে ওকলাহোমার নরমান শহরের বাসিন্দারা এক বিরল বায়ুমণ্ডলীয় বৈদ্যুতিক ঘটনার সাক্ষী হন, যা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রেড স্প্রাইট’ (Red Sprite) নামে পরিচিত। স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে শহরের পূর্ব আকাশে হঠাৎ এক উচ্চ উচ্চতার আলোর ঝলকানি দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি ছিল নিচের দিকে ধাবিত একটি আলোকস্তম্ভ, যা ওই অঞ্চলে বয়ে যাওয়া প্রবল বজ্রঝড়ের মাঝে রাতের আকাশকে মুহূর্তের জন্য আলোকিত করে তুলেছিল। এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে ওকলাহোমা সিটি এলাকায় টর্নেডোর খবর পাওয়া গিয়েছিল, যা ওই অঞ্চলে প্রবল বৈদ্যুতিক সক্রিয়তারই ইঙ্গিত দেয়।

বিজ্ঞানীরা দ্রুত এই ঘটনাটিকে ‘রেড স্প্রাইট’ হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যা মূলত বজ্রবাহী মেঘের অনেক উপরে তৈরি হওয়া একটি উচ্চ-উচ্চতার বৈদ্যুতিক নিঃসরণ। স্প্রাইটগুলো ‘ট্রানজিয়েন্ট লুমিনাস ইভেন্টস’ (TLE) বা ক্ষণস্থায়ী আলোক ঘটনার অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর আকৃতি অনেকটা জেলিফিশ বা লাল রঙের উজ্জ্বল স্তম্ভের মতো হয়, যার শাখাগুলো নিচের দিকে বজ্রমেঘের দিকে প্রসারিত থাকে। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৯০ কিলোমিটার উচ্চতায় এই বিস্ময়কর ঘটনাগুলো ঘটে এবং এগুলো স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ড। ট্রপোস্ফিয়ার এবং মহাকাশের নিকটবর্তী অঞ্চলের মধ্যে জটিল বৈদ্যুতিক মিথস্ক্রিয়া বোঝার জন্য এই ধরনের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তথ্যবহুল।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হলেও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, মেঘ থেকে ভূমিতে শক্তিশালী ধনাত্মক বজ্রপাতের ফলে এই লাল আভার সৃষ্টি হয়েছে। রেড স্প্রাইটের পাশাপাশি ব্লু জেট এবং এলভসের মতো অন্যান্য ক্ষণস্থায়ী আলোক ঘটনাগুলোও বিজ্ঞানীদের গভীর আগ্রহের বিষয়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) থাকা ‘এএসআইএম’ (ASIM) যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে এই ঘটনাগুলো নিয়ে গবেষণা চলছে। পৃথিবীর বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের সাথে বায়ুমণ্ডলীয় নিঃসরণের বৈশ্বিক সম্পর্ক এবং এর প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণাগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

ঐতিহাসিকভাবে, উচ্চ-গতির ক্যামেরা এবং সংবেদনশীল সেন্সর আবিষ্কারের আগে রেড স্প্রাইট সম্পর্কে খুব কমই জানা ছিল, কারণ এদের অতি স্বল্পস্থায়ী স্থায়িত্বের কারণে এগুলো ক্যামেরাবন্দি করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ কলিন প্রাইস উল্লেখ করেছেন যে, নির্দিষ্ট ধরনের বজ্রপাত বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে এই প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণ বজ্রপাত যেখানে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়, সেখানে একটি স্প্রাইট ৪৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এটি মূলত মেসোস্ফিয়ার এবং থার্মোস্ফিয়ারে শীতল প্লাজমার একটি নিঃসরণ। নাসা (NASA)-সহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিকদের সংগৃহীত তথ্য এই ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করতে বিশেষভাবে সাহায্য করছে।

যদিও সাধারণ মানুষের কাছে এই দৃশ্যটি বেশ অদ্ভুত এবং রহস্যময় মনে হতে পারে, তবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী এটি মাটিতে থাকা পর্যবেক্ষকদের জন্য কোনো বিপদের কারণ নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ক্ষণস্থায়ী আলোক ঘটনাগুলো পুড়ে যাওয়া ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের উপাদানের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে, যা বজ্রঝড়ের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে কণার গতিবেগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। নরমানের এই ঘটনাটি গ্রহের জটিল ইলেকট্রোডাইনামিক্স বা তড়িৎগতিবিজ্ঞান বোঝার ক্ষেত্রে একটি মূল্যবান সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি আবারও প্রমাণ করল যে, বায়ুমণ্ডলের এই ক্ষণস্থায়ী ঘটনাগুলো বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে এবং মহাকাশ গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

4 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • India Today

  • India Today

  • EarthSnap

  • Oreate AI Blog

  • NASA

এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।