গভীর জলের রহস্য উন্মোচন: মান্টা মাছের ১২৫০ মিটার ডুব ও নির্ভুল পরিযান

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

মান্টা রে কেন গভীর ডাইভিং করে?

২০২৫ সালে প্রকাশিত হওয়া নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য সমুদ্রের মান্টা মাছের (Mobula birostris) আচরণ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। জানা গেছে, দীর্ঘ দূরত্বে, অর্থাৎ ২০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দেওয়ার ঠিক আগে এই বিশাল আকারের মাছগুলো অবিশ্বাস্য গভীরতায় ডুব দেয়, যা ১,২৫০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। পূর্বে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে মান্টারা সাধারণত ১২০ মিটারের নিচে নামে না, যা ছিল সেই গভীরতা যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায়। এই আবিষ্কার তাদের জীবনযাত্রার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

Red Sea-এ manta ray-এর সাথে ডাইভিং

বিশ্বের বৃহত্তম এই রশ্মি জাতীয় মাছগুলো, যাদের পাখার বিস্তার সাত মিটার পর্যন্ত হতে পারে এবং ওজন দুই টনেরও বেশি হতে পারে, তাদের শান্ত ও মসৃণ গতিবিধি সবসময় গবেষকদের নজরে ছিল। কিন্তু গভীর, অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলে তাদের এই ডুব দেওয়ার প্রবণতা তাদের জীববিজ্ঞানের এক সম্পূর্ণ নতুন দিক তুলে ধরেছে, যা আগে আমাদের অজানা ছিল।

এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী দল পরিচালনা করেছিল, যার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মারডক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরাও ছিলেন। ২০১২ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দশ বছর ধরে তারা কাজ করেছেন। স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে তারা ২৪টি মান্টা মাছের উপর নজর রাখেন এবং ২৭০০ দিনেরও বেশি সময়ের ডেটা সংগ্রহ করেন। এই ডেটাগুলিতে মাছগুলোর গতিপথ, জলের গভীরতা এবং তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এই সময়ের মধ্যে মোট ৭৯টি চরম গভীর ডুবের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়, যার মধ্যে ৭১টি ডুবই নিউজিল্যান্ডের আওতেঅরোরা উপকূলে ঘটেছিল। এই তথ্যগুলো জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেয় যে এই গভীর ডুবগুলো শিকার করার জন্য নয়, বরং এটি তাদের পরিযানের জন্য একটি অপরিহার্য ‘নেভিগেশনাল আচরণ’ বা দিকনির্দেশক কার্যকলাপের অংশ।

নিউজিল্যান্ডের সমুদ্রতলের ভূ-প্রকৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানকার মহীসোপানের (continental shelf) হঠাৎ করে গভীর সমুদ্রের দিকে নেমে যাওয়া অংশগুলো মান্টাদের জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে তারা উত্তরের দিকে দীর্ঘ যাত্রার আগে ‘উল্লম্ব করিডোর’ ব্যবহার করতে পারে। ইন্দোনেশিয়া বা পেরুর মতো অঞ্চলে এই ধরনের ভৌগোলিক সুবিধা কম থাকায়, সেখানকার মান্টাদের আচরণে এই গভীর ডুবের প্রবণতা কম দেখা যায়, যা আঞ্চলিক আচরণের পার্থক্যকে ব্যাখ্যা করে।

গবেষকরা আরও লক্ষ্য করেছেন যে মান্টারা সর্বোচ্চ গভীরতায় বেশিক্ষণ অবস্থান করে না; তাদের গতিবিধি ধাপে ধাপে এবং স্বল্প সময়ের জন্য হয়। এই পর্যবেক্ষণটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে সমর্থন করে: মাছগুলো সমুদ্রের স্থিতিশীল বৈশিষ্ট্য—যেমন তাপমাত্রা, জলের ঘনত্বের স্তর এবং চৌম্বকীয় সংকেত—সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এই তথ্যগুলোই পরবর্তীতে খোলা সমুদ্রে দিক নির্ণয়ে সাহায্য করে, যেখানে কোনো দৃশ্যমান দিকনির্দেশক চিহ্ন থাকে না। এক কথায়, গভীর সমুদ্র তাদের জন্য এক প্রকার ‘ওশেনিক জিপিএস’ হিসেবে কাজ করে।

এই দশ বছরব্যাপী গবেষণার ফলাফল পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে মান্টাদের টিকে থাকা কেবল উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ওপরও নির্ভরশীল, যা বর্তমানে শিল্পভিত্তিক মৎস্য আহরণের কারণে মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। এই প্রজাতিকে রক্ষা করতে হলে, শুধুমাত্র তাদের চারণভূমি নয়, বরং এই গভীর ডুব দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোকেও সুরক্ষিত করা অপরিহার্য, কারণ এই পথগুলোর ওপরই তাদের সফল পরিযান নির্ভর করে।

উৎসসমূহ

  • Mongabay

  • Mongabay

  • Bird's Head Seascape

  • Earth.com

  • New Atlas

  • Forbes

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?

আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।