রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন কিউ-এর বিজ্ঞানীদের ১৯০টি নতুন প্রজাতির সন্ধান: ক্যামেরুনের বিশাল বৃক্ষ থেকে নামিবিয়ার বিরল সাকুলেন্ট
সম্পাদনা করেছেন: An goldy
২০২৬ সালের শুরুতে রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন কিউ (RBG Kew) এবং তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগীরা বৈজ্ঞানিক মহলে ১২৫টি নতুন উদ্ভিদ এবং ৬৫টি নতুন ছত্রাক প্রজাতির তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই বার্ষিক আবিষ্কারগুলো একদিকে যেমন পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের বিশাল ভাণ্ডারকে তুলে ধরে, অন্যদিকে প্রজাতি বিলুপ্তির ক্রমবর্ধমান হারের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকিকেও বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে গবেষকরা প্রায় ২৫০০টি নতুন উদ্ভিদ প্রজাতির বর্ণনা দিলেও, এখনও প্রায় ১,০০,০০০ উদ্ভিদ এবং ২০ থেকে ৩০ লক্ষ ছত্রাক প্রজাতি বিজ্ঞানের অগোচরে রয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
এই বছরের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ক্যামেরুনের ইবো (Ebo) বনভূমিতে পাওয়া 'প্লাজিওসিফন ইন্টারমিডিয়াম' (Plagiosiphon intermedium) নামক একটি বিশাল বৃক্ষ। শিম্বগোত্রীয় বা লেগুমিনাস পরিবারের এই গাছটি উচ্চতায় প্রায় ৩৪ মিটার পর্যন্ত হতে পারে এবং এর আনুমানিক ওজন প্রায় পাঁচ টন। এটি এই গবেষণা চক্রে বর্ণিত সবচেয়ে বড় এবং ভারী নতুন প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। প্রায় ৮০ বছর পর 'প্লাজিওসিফন' গণে এটিই প্রথম নতুন সংযোজন। দক্ষিণ ক্যামেরুনের এনগোভায়াং (Ngovayang) পর্বতমালায় সীমাবদ্ধ এই প্রজাতিটিকে বর্তমানে প্রাথমিক মূল্যায়নে 'বিপন্ন' (Endangered) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ইবো বনের অন্য একটি প্রজাতির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। 'ক্রিপ্টাক্যান্থাস ইবো' (Cryptacanthus ebo) নামক একটি ব্রোমেলিয়াড উদ্ভিদ সম্ভবত এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল থেকে ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবৈধ বন উজাড় এবং গাছ কাটার কারণেই এই করুণ পরিণতি বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন কিউ-এর আফ্রিকা টিমের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট মার্টিন চিক এই প্রসঙ্গে বলেন, 'যে জিনিসের নাম আমরা জানি না বা যা আমরা বুঝি না, তাকে রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন।' কিউ-এর 'স্টেট অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস প্ল্যান্টস অ্যান্ড ফাঞ্জাই ২০২৩' প্রতিবেদন অনুযায়ী, নামহীন প্রতি চারটি উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে তিনটিই বর্তমানে বিলুপ্তির হুমকির মুখে রয়েছে।
আফ্রিকার অন্য প্রান্তে, নামিবিয়ার মোপানে বনাঞ্চলে 'লিথোপস গ্রাসিলিডিলিনিয়াটা সাবস্পিসিস মোপানে' (Lithops gracilidelineata subsp. mopane) নামক একটি নতুন ধরনের 'জীবন্ত পাথর' বা সাকুলেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এই উদ্ভিদটি তার মসৃণ এবং ধূসর-সাদা পাতার জন্য পরিচিত, যা অন্যান্য উপপ্রজাতির তুলনায় দৃশ্যত আলাদা। উত্তর-পশ্চিম নামিবিয়ার মাত্র একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এই উদ্ভিদটি পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যবশত, শৌখিন বাগান করার জন্য অবৈধভাবে এই উদ্ভিদ সংগ্রহের ফলে এটি মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন। ডক্টর চিক জোর দিয়ে বলেন যে, প্রতিটি বৈজ্ঞানিক নামকরণ বাস্তুসংস্থান বুঝতে সাহায্য করে, যা ছাড়া কোনো সংরক্ষণ প্রচেষ্টাই সফল হওয়া সম্ভব নয়।
যদিও 'পি. ইন্টারমিডিয়াম'-এর বিস্তৃতি বর্তমানে পরিচিত ০.৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকার চেয়ে বেশি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে, তবুও 'সি. ইবো' এবং 'এল. গ্রাসিলিডিলিনিয়াটা সাবস্পিসিস মোপানে'-এর মতো প্রজাতিগুলোর অস্তিত্ব রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এই সংরক্ষণ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে স্থানীয় অংশীদারদের সাথে কাজ করা এবং ওয়েকহার্স্টের মিলেনিয়াম সিড ব্যাংকের মতো সুরক্ষিত স্থানে বীজের মজুদ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই নতুন আবিষ্কারগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন এবং তা রক্ষার লড়াইয়ে বিজ্ঞানের ভূমিকা কতটা অপরিহার্য।
পরিশেষে, এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানগুলো কেবল নতুন নাম যুক্ত করার জন্য নয়, বরং পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি নতুন প্রজাতি আমাদের বাস্তুতন্ত্রের জটিল জাল সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রদান করে। গবেষকরা মনে করেন, যদি আমরা এই অজানা প্রজাতিগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করতে না পারি, তবে অনেক মূল্যবান উদ্ভিদ ও ছত্রাক আমাদের অগোচরেই পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রসার এখন সময়ের দাবি যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় পৃথিবী পেতে পারে।
15 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Nouvelles de l'environnement
Mongabay
Discover Wildlife
Popular Science
ResearchGate
Kew Science
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
