আন্তার্কটিকার এই এখনও নামহীন দ্বীপটি শুরুতে একটি 'ময়লা আইসবার্গ' হিসেবে ধরা হয়েছিল। এর দৈর্ঘ্য ১৩০ মিটার এবং প্রস্থ ৫০ মিটার।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যান্টার্কটিকার ওয়েডেল সাগরে এক চাঞ্চল্যকর ভৌগোলিক আবিষ্কার সম্পন্ন হয়েছে। জার্মান বরফ ভাঙা জাহাজ এআইডব্লিউ (AWI) 'পোলারস্টার্ন'-এ থাকা একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী দল এসডব্লিউওএস (SWOS) মিশনের অংশ হিসেবে এই নতুন ভূখণ্ডটি খুঁজে পান। প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে বাঁচতে জাহাজটি যখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছিল, তখন ক্রু সদস্যরা প্রথমে এটিকে একটি নোংরা আইসবার্গ বা বরফখণ্ড বলে ভুল করেছিলেন। তবে নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এটি আসলে একটি দ্বীপ যা জলস্তর থেকে প্রায় ১৬ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। প্রায় ১৩০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৫০ মিটার প্রস্থের এই ভূখণ্ডটি বিশ্ব জলবায়ু ও সামুদ্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওয়েডেল সাগর অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে।
ড্রোন এবং মাল্টিবিম ইকোসাউন্ডারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ভূখণ্ডের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, নৌ-মানচিত্রে এই এলাকাটি আগে 'অনিশ্চিত বিপদ' হিসেবে চিহ্নিত ছিল এবং এর অবস্থান প্রকৃত স্থান থেকে প্রায় এক নটিক্যাল মাইল দূরে দেখানো হয়েছিল। আলফ্রেড ওয়েগনার ইনস্টিটিউটের (AWI) সমুদ্রতল ম্যাপিং বিশেষজ্ঞ সাইমন ড্রয়েটার লক্ষ্য করেন যে, তথাকথিত আইসবার্গটি দেখতে বেশ কর্দমাক্ত বা নোংরা, যা তাকে দ্বীপটি শনাক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমানে এই দ্বীপটির কোনো দাপ্তরিক নাম না থাকলেও শীঘ্রই এটি আন্তর্জাতিক নৌ-মানচিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এসডব্লিউওএস (সামার ওয়েডেল সি আউটফ্লো স্টাডি) মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল ২০১৭ সাল থেকে উত্তর-পশ্চিম ওয়েডেল সাগরে গ্রীষ্মকালীন সামুদ্রিক বরফের নাটকীয় হ্রাস অনুসন্ধান করা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণেই এমনটি ঘটছে। চিলির পুন্তা অ্যারেনাস থেকে যাত্রা শুরু করা পোলারস্টার্ন জাহাজটি জার্মান মেরু গবেষণা কর্মসূচির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নয়টি অত্যাধুনিক গবেষণাগার সমৃদ্ধ এই জাহাজটি মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করতে সক্ষম এবং এটি প্রায় ২ মিটার পুরু বরফ ভেঙে এগিয়ে যেতে পারে। গবেষকরা সমুদ্রের তলদেশ থেকে বায়ুমণ্ডল পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন।
ঐতিহাসিকভাবে ওয়েডেল সাগর তার ঘন এবং পরিবর্তনশীল বরফের স্তরের জন্য নাবিকদের কাছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। ১৯৭৯ সাল থেকে আর্কটিক অঞ্চলে প্রতি দশকে প্রায় ১২ শতাংশ হারে বরফ কমলেও, অ্যান্টার্কটিকার বরফ দীর্ঘকাল স্থিতিশীল বলে মনে করা হতো। তবে এআইডব্লিউ (AWI) দলের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। এই নতুন দ্বীপের আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ মহাসাগরের অনেক অংশ এখনও আমাদের কাছে কতটা অজানা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অঞ্চলের রূপান্তর বুঝতে এসডব্লিউওএস-এর মতো মিশনগুলো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
৯৩ জন আন্তর্জাতিক সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত এই গবেষণা দলটি ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল ফকল্যান্ড (মালভিনাস) দ্বীপপুঞ্জে তাদের অভিযান সমাপ্ত করার পরিকল্পনা করেছে। পোলারস্টার্ন জাহাজে অবস্থানকালে বিজ্ঞানীরা বরফের পুরুত্ব পরিমাপ, জলরাশি বিশ্লেষণ এবং গভীর সমুদ্রে পুষ্টি উপাদান ও কার্বনের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছেন। এই নতুন আবিষ্কারটি কেবল মানচিত্রের একটি বিন্দু নয়, বরং এটি এই দুর্গম অঞ্চলের ভূতত্ত্ব এবং সমুদ্রবিদ্যা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে। ভবিষ্যতের জলবায়ু মডেল তৈরিতে এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।