আফ্রিকা মহাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো উন্নয়নে ইতালি, ভারত ও কেনিয়ার ঐতিহাসিক চুক্তি

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

আফ্রিকা মহাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির প্রসার ও এর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইতালি, ভারত এবং কেনিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগটি মূলত 'এআই হাব ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট' বা টেকসই উন্নয়নের জন্য এআই হাবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এই সহযোগিতার মূল লক্ষ্য হলো আফ্রিকান দেশগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা।

২০২৬ সালের ১৬ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত 'গ্লোবাল এআই ইমপ্যাক্ট সামিট' বা বিশ্ব এআই প্রভাব শীর্ষ সম্মেলনের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। এই অংশীদারিত্বটি ইতালীয় সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত আফ্রিকার জন্য 'মাত্তেই প্ল্যান' (Mattei Plan)-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সহযোগিতার অধীনে ২০২৬ সাল থেকেই ১৫টি অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য এআই ব্যবহারের ১০০টি ভিন্ন পথ বা মাধ্যম তৈরি করা।

বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশ এআই কম্পিউটিং ক্ষমতার দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে, বিশেষ করে জিপিইউ (GPU) এবং টিপিইউ (TPU)-এর মতো শক্তিশালী প্রসেসরের অভাব সেখানে প্রকট। তবে এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মহাদেশটিতে ডেটা বা তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার, নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস এবং কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রে এআই প্রয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় ভাষাগুলোর উন্নয়নেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো 'সভেরেন এআই' (Sovereign AI) বা সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হবে যে, আফ্রিকার নিজস্ব ডেটা এবং মডেলগুলো যেন শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণে না চলে যায়। বরং এই প্রযুক্তিগত সম্পদগুলো যেন সংশ্লিষ্ট আফ্রিকান দেশগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণেই থাকে, যা তাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ইতালি তার 'মাত্তেই প্ল্যান'-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে আফ্রিকার ১৪টি দেশকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং সেখানে এআই-সহ প্রায় ১০০টি ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত তার সফল 'ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার' (DPI) বা ডিজিটাল জন-অবকাঠামো মডেলটি বিশ্বজুড়ে রপ্তানি করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই কেনিয়া, ইথিওপিয়া এবং তানজানিয়াসহ আফ্রিকার ৬টি দেশ ভারতের এই ডিজিটাল মডেল গ্রহণের লক্ষ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

এই উদ্যোগের সঠিক বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি ত্রিপক্ষীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ বা কার্যনির্বাহী দল গঠন করা হবে। এই দলটি প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ১৫টি পাইলট প্রকল্পের তদারকি করবে। যদিও বর্তমানে স্বাক্ষরিত এই নথিটি একটি 'লেটার অফ ইনটেন্ট' বা অভিপ্রায়পত্র এবং এটি আইনত বাধ্যতামূলক নয়, তবুও বাস্তবমুখী কাজের প্রতি দেশগুলোর একাগ্রতা তাদের দৃঢ় সংকল্পের পরিচয় দেয়।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে কেনিয়াকে এই প্রকল্পের একটি প্রধান কম্পিউটিং হাব বা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশটির ক্রমবর্ধমান ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্ক এবং শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বা নতুন উদ্যোক্তাদের পরিবেশ কেনিয়াকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে কেনিয়া শুধু নিজের প্রযুক্তিগত উন্নয়নই করবে না, বরং সমগ্র পূর্ব আফ্রিকার ডিজিটাল রূপান্তরে নেতৃত্ব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

20 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • mimit.gov.it

  • MEA

  • Borsa Italiana

  • AI Impact Summit 2026: accordo strategico Italia, India e Kenya per progetti AI in Africa

  • Ascuolaoggi

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।