গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষোভ: এক গভীর কূটনৈতিক সংকট

সম্পাদনা করেছেন: gaya ❤️ one

২০২৬ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা দেখা দেয়, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরের কাছে পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তা এই উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটায়। ট্রাম্প সেখানে সরাসরি অভিযোগ করেন যে, নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি তাকে ২০২৫ সালের শান্তি পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করেছে, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত মার্কিন নীতিতে। এই ঘটনাটি ওয়াশিংটন এবং ইউরোপের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্পের সেই বার্তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, "যেহেতু আপনার দেশ আমাকে ৮টিরও বেশি যুদ্ধ থামানোর জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই আমি আর কেবল শান্তির কথা ভাবতে বাধ্য নই।" তিনি আরও যোগ করেন যে, এখন থেকে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা ভালো এবং সঠিক মনে করবেন, সেই পথেই হাঁটবেন। এই হুমকির পরপরই তিনি ঘোষণা করেন যে, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে ১ জুনের মধ্যে ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড এবং ব্রিটেনের মতো দেশগুলো, যারা এর আগেও ট্রাম্পের মেয়াদে শুল্ক যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছিল, তারা আবারও চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোর অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন। তিনি ট্রাম্পকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানকারী কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং নরওয়ে সরকারের সাথে এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের লক্ষ্য অনেক বেশি কৌশলগত। তিনি বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে আর্টিক অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ও কৌশলগত আধিপত্য বিস্তারের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। ট্রাম্পের দাবি, ডেনমার্ক এই দ্বীপটিকে রাশিয়া এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসী অবস্থানের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) দ্রুত ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে ইইউ রাষ্ট্রদূতদের এক জরুরি বৈঠকে মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই পরিস্থিতিতে 'অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট' (ACI) বা তথাকথিত "ট্রেড বাজুকা" সক্রিয় করার জোরালো আহ্বান জানান। উল্লেখ্য যে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে অনুমোদিত এবং ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৩ থেকে কার্যকর হওয়া এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাতিয়ারটি এর আগে কখনও ব্যবহার করা হয়নি। এটি ইইউ-কে কোনো দেশের অর্থনৈতিক জবরদস্তির বিরুদ্ধে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনি ক্ষমতা প্রদান করে।

পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরো) মূল্যের আমেরিকান পণ্যের ওপর স্থগিত থাকা শুল্ক পুনরায় চালুর কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। এই সংকটটি কেবল একটি বাণিজ্যিক বিরোধ নয়, বরং এটি ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্কের একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। যেখানে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত অসন্তোষ ন্যাটোর মতো সামরিক জোটের মিত্রদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে, নরওয়ের পার্লামেন্ট বা 'স্টর্টিং' দ্বারা নির্বাচিত পাঁচ সদস্যের নোবেল কমিটি তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিরপেক্ষতাই এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

10 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • cbn

  • RTP Notícias

  • Agência Brasil

  • Opera Mundi

  • Sputnik Brasil

  • CNN Portugal

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।