ইইউ ও অস্ট্রেলিয়ার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনা: মাংসের কোটা এবং জিআই ট্যাগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা পুনরায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে এই আলোচনা সাময়িকভাবে থমকে গেলেও, ২০২৬ সালের ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো একটি ইতিবাচক মোড় নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রী ডন ফারেল এবং ইউরোপীয় কমিশনার মারোশ শেফচোভিচ ও ক্রিস্টোফ হ্যানসেনের মধ্যে এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই কূটনৈতিক তৎপরতা প্রমাণ করে যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে ইইউ অস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে কতটা আগ্রহী।

তবে এই চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো দুটি প্রধান অন্তরায় বিদ্যমান। প্রথমত, অস্ট্রেলিয়ার রেড মিট বা লাল মাংসের (গরু ও ভেড়া) জন্য ইউরোপের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। প্রায় ৪৫ কোটি ভোক্তার এই বাজারে নিজেদের অবস্থান গড়তে ক্যানবেরা অনড় অবস্থানে রয়েছে। তারা দাবি করছে যে, বছরে অন্তত ৩০,০০০ টন গরুর মাংস শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানির সুযোগ দিতে হবে, যা পরবর্তীতে ৪০,০০০ টন পর্যন্ত উন্নীত করার বিধান থাকতে হবে। মূলত এই কৃষি কোটা নিয়ে মতবিরোধের কারণেই গত বছর আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছিল, যা অস্ট্রেলীয় রপ্তানিকারকদের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।

দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জটি হলো ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশনস (GIs) সংক্রান্ত জটিলতা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় যে, 'প্রোসেকো' বা 'ফেটা' পনিরের মতো নামগুলো যেন শুধুমাত্র ইউরোপীয় উৎপাদকরাই ব্যবহার করতে পারে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ আলোচনার পথে পণ্যের এই লেবেলিং বা নামকরণ সংক্রান্ত বিতর্কটি একটি বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রী ডন ফারেল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, অস্ট্রেলিয়া চুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকলেও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো সমঝোতায় তারা পৌঁছাবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, কেবল চুক্তির খাতিরে কোনো চুক্তিতে অস্ট্রেলিয়া সই করবে না।

এই আলোচনার নেপথ্যে কাজ করছে বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন তাদের প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ, বিশেষ করে লিথিয়াম এবং তামার সরবরাহের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। বিশ্বজুড়ে সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যিক নীতির চাপের মুখে একটি শক্তিশালী ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা উভয় পক্ষের জন্যই জরুরি হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৮৭.৫ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে, যা ইইউ-কে অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যদি এই দফার আলোচনা সফল হয়, তবে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে অস্ট্রেলিয়া সফর করতে পারেন এবং সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের বাইরেও এই আলোচনা একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা গেছে যে, উভয় পক্ষ একটি পৃথক নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইইউ ও অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক এখন আর কেবল বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপীয়-অস্ট্রেলীয় বিজনেস কাউন্সিলের প্রধান জেসন কলিন্স এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে দুটি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এই চুক্তির কোনো বিকল্প নেই।

8 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • La Voce d'Italia

  • The Guardian

  • Ground News

  • SBS News

  • Drive

  • The Nightly

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।