মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা সংকট: মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এক চরম উত্তেজনাকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের ফলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এই সংকটের সূত্রপাত ঘটে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। বর্তমানে এই সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রাথমিক হামলার জবাবে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালীর জাহাজ চলাচল। এর ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পণ্য পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে তার মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সক্রিয় সামরিক সহায়তা কামনা করছেন। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালীর জলসীমায় ইরানের সম্ভাব্য মাইন স্থাপনের তৎপরতা রুখতে তিনি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছেন। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ নিশ্চিত করেছেন যে, বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অংশগ্রহণকে ওয়াশিংটন একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, মিত্রদের অংশগ্রহণকে কেবল স্বাগত জানানোই হবে না, বরং এটি এখন সময়ের দাবি এবং মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটি প্রত্যাশিত। ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা যৌথ টহল দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করছে এবং যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও জাপানের মতো দেশগুলো থেকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর জন্য জোরালো আহ্বান জানাচ্ছে।

সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে মার্কিন মিত্রদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য কাতার, ইরাক এবং সাইপ্রাসে তাদের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (RAF) সম্পদ মোতায়েন করেছে মূলত রক্ষণাত্মক সুরক্ষার জন্য, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী অনুরোধগুলোর বিষয়ে তারা বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্স একটি বিমানবাহী রণতরীসহ নৌবাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন যে, তিনি 'অপারেশন আস্পাইডস' (Operation ASPIDES)-এর আওতায় একটি ইউরোপীয় এসকর্ট মিশনের নেতৃত্ব দিতে চান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সংঘাতের 'সবচেয়ে উত্তপ্ত পর্যায়' শেষ হওয়ার পর এই মিশনটি হবে সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক এবং সহায়তামূলক। মূলত লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার জন্য গঠিত এই অপারেশনটি এখন হরমুজ প্রণালীতেও নজরদারি চালাবে বলে জানানো হয়েছে।

এই সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ৮ মার্চের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা সরাসরি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ফল। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পরবর্তীতে স্পষ্ট করেছেন যে, এই প্রণালীটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি; বরং এটি কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের ট্যাঙ্কার ও জাহাজের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তার খাতিরে অনেক জাহাজই এই পথ এড়িয়ে চলছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে ফ্রান্স এবং ইতালি তেহরানের সাথে গোপন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে ইউরোপীয় জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা যায়, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ কৌশলগত মতভেদকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Deutsche Welle

  • US-Israel strikes on Iran: February/March 2026 - House of Commons Library

  • Iran war: What is happening on day 16 of US-Israel attacks? | Explainer News | Al Jazeera

  • Trump Requests Warships for Strait of Hormuz

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।