পারমাণবিক বিরোধ ও বিক্ষোভের মুখে ইরানের কাছে নৌবাহিনী মোতায়েন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি, শুক্রবার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সীমান্তের কাছে তাদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানের জলসীমার দিকে একটি শক্তিশালী নৌ-মহড়া বা নৌবাহিনী পাঠানো হচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই নৌবহরের শক্তি ও সদস্য সংখ্যা ভেনিজুয়েলার উপকূলে আগে মোতায়েন করা বাহিনীর চেয়েও অনেক বেশি। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে কঠোর শর্ত আরোপ করার পরই এই বড় ধরনের সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) আওতাধীন এলাকায় মার্কিন সামরিক শক্তি এখন এক সংকটময় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে সেখানে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বেড়ে ১১টিতে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আগে ১০টির কথা জানানো হয়েছিল। পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী 'ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন'-এর নেতৃত্বে একটি স্ট্রাইক গ্রুপ আরব সাগরে টহল দিচ্ছে, যা ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই বহরের ডেস্ট্রয়ারগুলো ১,৬০০ কিলোমিটার পাল্লার টমাহক ক্রুজ মিসাইলে সজ্জিত। এছাড়া পেন্টাগন প্যাট্রিয়ট এবং থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে ওই অঞ্চলের সুরক্ষা জোরদার করেছে। সেই সঙ্গে ১৫৪টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম 'ইউএসএস জর্জিয়া' এবং 'ইউএসএস সাউথ ডাকোটা' নামক পারমাণবিক সাবমেরিনও ওই অঞ্চলে অবস্থান করছে।

মার্কিন এই সামরিক তৎপরতার জবাবে ইরানও নিজস্ব প্রস্তুতি প্রদর্শন করছে। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে সরাসরি গুলিবর্ষণের মাধ্যমে নিজস্ব নৌ-মহড়া পরিচালনা করছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলী শামখানি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, তেহরান কেবল সমুদ্রে নয়, বরং আরও বড় পরিসরে যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইরান এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি ভালো জানে, যা তাদের কৌশলগত সুবিধা প্রদান করবে।

কূটনৈতিক পর্যায়ে তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ৩০ জানুয়ারি ইস্তাম্বুলে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর তিনি গণমাধ্যমে কথা বলেন। আরাগচি জানান, ইরান সমমর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনায় বসতে রাজি, তবে তার আগে হুমকি ও চাপমুক্ত একটি 'অনুকূল পরিবেশ' তৈরি করতে হবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাসহ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো বিষয় আলোচনার টেবিলে তোলা হবে না। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের সামনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা না করার মতো একগুচ্ছ কঠোর দাবি পেশ করেছে।

এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে ইরানে ঘটে যাওয়া ব্যাপক গণবিক্ষোভ, যেখানে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। মানবাধিকার কর্মীদের তথ্যমতে, বিক্ষোভ দমনে নিহতের সংখ্যা ৬,০০০ ছাড়িয়ে গেছে, যদিও ইরান সরকার এই সংখ্যা অনেক কম বলে দাবি করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে উল্লেখ করেছিলেন যে, ইরান ৮০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে, যা তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন। তবে ইরান পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের খবর অস্বীকার করে। এই সংঘাতের প্রেক্ষাপট হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে পরিচালিত 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার'-এর কথা উল্লেখ করা যায়, যখন মার্কিন বিমান বাহিনী ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও মার্কিন মিত্ররা ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে মার্কিন নৌবাহিনীর বোয়িং পি-৮এ পসেইডন (Boeing P-8A Poseidon) গোয়েন্দা বিমানগুলো ইরানের আকাশসীমার খুব কাছ দিয়ে নিয়মিত টহল ও নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। এই সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

2 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Deutsche Welle

  • Deutsche Welle

  • The National News

  • The Guardian

  • AFP

  • Bernama

  • IRNA English

  • TRT World

  • Al Jazeera

  • The Guardian

  • Institute for the Study of War (ISW)

  • Iran International

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।