২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করছে ফ্রান্স; সব লাইসিয়ামে মোবাইল ফোনও নিষিদ্ধ হচ্ছে

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য দেশব্যাপী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে একটি দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। রাষ্ট্রপ্রধান এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিলটি পাস নিশ্চিত করতে সিনেটকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো মার্কিন এবং চীনা প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমের নেতিবাচক প্রভাব থেকে তরুণ প্রজন্মের মানসিক, কগনিটিভ এবং আবেগীয় বিকাশকে সুরক্ষা প্রদান করা।

'রেনেসাঁ' পার্টির সংসদ সদস্য লরা মিলারের জোরালো নেতৃত্বে এই আইনি উদ্যোগটি বর্তমানে অগ্রসর হচ্ছে। এই নতুন আইনে কেবল সোশ্যাল মিডিয়া নয়, বরং ফ্রান্সের সব মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা লাইসিয়ামেও মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি মূলত ২০১৮ সাল থেকে প্রাথমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর থাকা বিধিনিষেধেরই একটি বর্ধিত রূপ। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ লাইসিয়ামগুলোতে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্তকে সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং শক্তিশালী সংকেত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ফ্রান্সের এই কঠোর সিদ্ধান্তটি মূলত অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের অংশ। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর আইনটি কার্যকর হওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় প্রায় ৪.৭ মিলিয়ন অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, যুক্তরাজ্যের হাউস অফ লর্ডস সম্প্রতি একটি সমজাতীয় নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করেছে এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন।

এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পেছনে জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর উদ্বেগ এবং আইনি জটিলতাগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করছে। ফরাসি স্বাস্থ্য সংস্থা ANSES তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, অত্যধিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সাথে কিশোর-কিশোরীদের আত্মসম্মান বোধ কমে যাওয়া এবং আত্মক্ষতি বা আত্মহত্যার মতো বিপজ্জনক কন্টেন্টের প্রতি আসক্তি বৃদ্ধির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। এই আশঙ্কার সত্যতা মিলেছে যখন বেশ কয়েকটি ফরাসি পরিবার টিকটকের বিরুদ্ধে আইনি মামলা দায়ের করেছে। তারা অভিযোগ করেছে যে, এই প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকারক কন্টেন্ট তাদের সন্তানদের জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি এবং ট্র্যাজিক পরিণতি ডেকে এনেছে।

লরা মিলার উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান বিলটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বয়স যাচাইকরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করা। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রবেশের সময় ব্যবহারকারীর প্রকৃত বয়স যাচাই করার মতো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই সমস্যার ভয়াবহতা তুলে ধরেছে: ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রায় ৯০% প্রতিদিন স্মার্টফোন ব্যবহার করে, যার মধ্যে ৫৮% সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি দুইজনে একজন কিশোর প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় তাদের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ব্যয় করে।

যদিও বৈজ্ঞানিক মহলের একাংশ এই বিষয়ে আরও গভীর গবেষণা এবং প্রমাণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন, তবে ফরাসি কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ANSES-এর তথ্য এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্তগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারা মনে করেন যে, পরবর্তী প্রজন্মের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে এখনই প্রতিরোধমূলক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এই আইনটি কার্যকর হলে তা কেবল ফ্রান্সের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের ডিজিটাল নীতিমালার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

8 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Fox News

  • Euractiv

  • India TV News

  • WION

  • Hindustan Times

  • Reuters

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।