কার্নির সফরের পর বেইজিং ও অটোয়ার মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত
সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush
২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে ওয়াং ই বেইজিংয়ের সাথে সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে কানাডার নতুন পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মূলত ২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির চীন সফরের মাধ্যমেই দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক 'নতুন যুগের' সূচনা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের শীতলতা কাটিয়ে উষ্ণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অটোয়ার এই নীতি পরিবর্তনকে ওয়াং ই একটি 'সঠিক সিদ্ধান্ত' হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্নি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনার পর একটি নতুন ধরনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। ২০১৮ সালে ভ্যাঙ্কুভারে হুয়াওয়ের সিএফও মেং ওয়ানঝুর গ্রেপ্তারের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে তা নিরসনের একটি জোরালো প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে আরোপিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাধাগুলো দূর করার লক্ষ্যে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ছাড়ও এই সমঝোতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই নতুন চুক্তির অধীনে কানাডা প্রতি বছর ৪৯,০০০ চীনা বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) আমদানির কোটা প্রদান করবে, যার ওপর শুল্কের হার হবে মাত্র ৬.১ শতাংশ। উল্লেখ্য যে, আগে এই শুল্কের হার ছিল ১০০ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে এই আমদানির সীমা ৭০,০০০ ইউনিটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর বিনিময়ে চীন ২০২৬ সালের ১ মার্চের মধ্যে কানাডিয়ান রেপসিডের ওপর শুল্ক প্রায় ৮৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আদেশ উন্মুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও কানাডিয়ান সামুদ্রিক খাবার, কাঁকড়া এবং মটরশুঁটির ওপর থেকে সমস্ত শুল্ক অচিরেই প্রত্যাহার করা হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ প্রধানমন্ত্রী কার্নির এই সফরকে 'অত্যন্ত সফল' এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সফর দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং কানাডিয়ান নাগরিকদের জন্য চীন কর্তৃক ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদানের সিদ্ধান্তকে তিনি স্বাগত জানান। ২০১৭ সালের পর কোনো কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম চীন সফর মূলত পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছিল:
- জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি।
- কৃষি-বাণিজ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং বাজারজাতকরণ।
- বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি সংহতি।
- আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
- বৈশ্বিক শাসন কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা।
অটোয়ার এই কৌশলগত পরিবর্তনকে অনেক বিশেষজ্ঞ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিদ্যমান বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মুখে নিজেদের বাজার বহুমুখীকরণের একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
পারস্পরিক আস্থা পুনরুদ্ধারের পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে কানাডিয়ান নাগরিক রবার্ট শ্যালেনবার্গের মৃত্যুদণ্ড বাতিলের সিদ্ধান্তকে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে চীন এই ঘোষণা দেয়। উল্লেখ্য যে, শ্যালেনবার্গকে ২০১৪ সালে প্রথম সাজা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ২০১৯ সালে মেং ওয়ানঝু মামলার উত্তেজনার মধ্যে তার সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করা হয়। বর্তমানে তিনি লিয়াওনিং প্রদেশে মামলার পুনঃপর্যালোচনার জন্য বিচার বিভাগীয় হেফাজতে থাকলেও, তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ বেইজিংয়ের নমনীয় ও গঠনমূলক কূটনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কানাডায় বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে চীনের যৌথ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করবে। এই অংশীদারিত্বের মূল লক্ষ্য হলো বাহ্যিক কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ ছাড়াই কানাডার অর্থনীতিকে একটি টেকসই এবং স্বাধীন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।
19 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Deutsche Welle
Munich Panel Faces Sharp Question On Arctic Militarization | DRM News | AC1F - YouTube
Preliminary Agreement-In-Principle to Address Economic and Trade Issues between Canada and the People's Republic of China
Canada and China reach consensus on a “strategic partnership”: What your business needs to know
Latest Wang Yi - The Straits Times
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
