মৌমাছির গাণিতিক বোধ: মহাজাগতিক যোগাযোগের জন্য সার্বজনীন মডেলের প্রস্তাব

সম্পাদনা করেছেন: Tetiana Martynovska 17

সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্র মহাজাগতিক দূরত্বের বাধা অতিক্রম করে দুটি ভিন্ন বুদ্ধিমত্তার মধ্যে যোগাযোগের ভিত্তি হিসেবে গণিতকে প্রস্তাব করেছে, যেখানে পার্থিব মডেল হিসেবে মৌমাছির গাণিতিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধারণাটি এমআইটি প্রেস ডাইরেক্টের জার্নাল 'লিওনার্ডো'-তে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হলো, যদি কোনো বুদ্ধিমান বহির্জাগতিক সভ্যতা বিদ্যমান থাকে, তবে তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য একটি সর্বজনীন ভাষা খুঁজে বের করা, যেখানে গণিতকে একটি সম্ভাব্য 'লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা' হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, মানুষের সাথে মৌমাছির বিবর্তনীয় বিচ্ছেদ ঘটেছে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন বছর আগে, তবুও মৌলিক গাণিতিক ধারণা উপলব্ধিতে তাদের মধ্যে আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে। এই গবেষণার পরীক্ষামূলক প্রমাণগুলি মূলত ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছিল, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার মন্যাশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়—এর গবেষকরা অংশ নিয়েছিলেন। এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মৌমাছিরা শূন্যের ধারণা বুঝতে পারে, যা পূর্বে কেবল মানুষ, কাক এবং কিছু প্রাইমেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হতো। উপরন্তু, তারা যোগ ও বিয়োগের মতো সরল গাণিতিক ক্রিয়াকলাপও সম্পাদন করতে সক্ষম, যেখানে তারা রঙের প্রতীকী ব্যবহার করে যোগ (+) বা বিয়োগ (-) চিহ্নকে চিহ্নিত করতে শিখেছে।

এই ধরনের গাণিতিক প্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নিয়ম এবং স্বল্পমেয়াদী কার্যকারী স্মৃতি (ওয়ার্কিং মেমরি) উভয়ই প্রয়োজন, যা মৌমাছির ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের জটিল প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা প্রমাণ করে। মন্যাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আরও আবিষ্কার করেছেন যে মৌমাছিরা মানুষের মতোই বাম থেকে ডানে সংখ্যাগুলিকে ক্রমানুসারে সাজাতে পছন্দ করে, যা তাদের সংখ্যাগত এবং স্থানিক প্রক্রিয়াকরণের দক্ষতার প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ডায়ার উল্লেখ করেছেন যে শূন্যের ধারণা আধুনিক গণিত এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তি, এবং এটি শিশুদেরও সহজে আয়ত্ত করতে কয়েক বছর সময় লাগে। এই গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে উন্নত সাংখ্যিক জ্ঞান কেবল বিশাল মস্তিষ্কের প্রাণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের প্রাণীদের মধ্যেও এটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিকাশের নতুন পথ উন্মোচন করতে পারে।

গণিতকে মহাবিশ্বের ভাষা হিসেবে দেখার ধারণাটি নতুন নয়; সপ্তদশ শতাব্দীতে গ্যালিলিও গ্যালিলি তাঁর 'ইল সাগিয়াটোর' (The Assayer) গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন যে মহাবিশ্ব গাণিতিক ভাষায় লেখা, যার অক্ষর হলো ত্রিভুজ, বৃত্ত এবং অন্যান্য জ্যামিতিক আকার। মহাজাগতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে, নিকটতম তারার কাছে একটি বার্তা পাঠিয়ে ফিরে আসতে এক দশকেরও বেশি সময় লাগতে পারে, তাই গণিতের মতো একটি সর্বজনীন ভিত্তি অপরিহার্য। এই ধারণার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় ১৯৭৪ সালে প্রেরিত আরেসিবো বার্তার (Arecibo message) মাধ্যমে, যা মহাবিশ্বের কাছে মানবতা সম্পর্কে তথ্য পাঠাতে ১,৬৭৯টি বাইনারি অঙ্ক ব্যবহার করেছিল, যেখানে ১,৬৭৯ সংখ্যাটির দুটি মৌলিক গুণনীয়ক হলো ২৩ এবং ৭৩। একইভাবে, ১৯৭৭ সালে প্রেরিত ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডসও গাণিতিক ও ভৌত পরিমাণ ব্যবহার করেছিল।

এই গবেষণার মূল প্রশ্ন হলো, মানব ও মৌমাছির মধ্যে বিবর্তনীয় দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও যদি মৌলিক গণিত বোধের মিল থাকে, তবে মহাজাগতিক স্তরেও কি একই ধরনের গাণিতিক ভিত্তি কাজ করতে পারে? গবেষকদের মতে, মৌমাছিরা আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী সম্পর্কিত প্রাণীগুলির মধ্যে একটি, যাদের শারীরস্থান, মস্তিষ্কের আকার এবং সংস্কৃতি মানুষের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, তবুও তাদের গাণিতিক বোধের সাদৃশ্য ইঙ্গিত দেয় যে গণিত মানব-কেন্দ্রিক ধারণা নাও হতে পারে। এই গবেষণাটি মহাজাগতিক অনুসন্ধানের পদ্ধতিকে প্রসারিত করার এবং মানবজাতির একাকীত্ব নিয়ে চলমান প্রশ্নটির একটি নতুন কাঠামো প্রদান করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

17 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Space.com

  • Universe Today

  • Science Alert

  • VICE

  • Science Alert

  • nasaspacenews

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।