আকাশ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ: ওভারভিউ এনার্জির বৈপ্লবিক উদ্ভাবন

লেখক: an_lymons

শক্তি স্থানান্তরণ

ওভারভিউ এনার্জি (Overview Energy) নামক একটি উদ্ভাবনী স্টার্টআপ কোম্পানি তারহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় এবং যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে। প্রথমবারের মতো তারা একটি উড়ন্ত বিমান থেকে সরাসরি ভূপৃষ্ঠে অবস্থিত সোলার প্যানেলে বিদ্যুৎ পাঠাতে সক্ষম হয়েছে, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সফল পরীক্ষাটি মহাকাশ-ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো কোনো বিরতি ছাড়াই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পৃথিবীকে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য শক্তি সরবরাহ করতে পারবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট নিরসনে অত্যন্ত সহায়ক হবে।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে পেনসিলভানিয়ার আকাশে এই ঐতিহাসিক এবং রোমাঞ্চকর পরীক্ষাটি সম্পন্ন করা হয়। একটি সেসনা ক্যারাভান (Cessna Caravan) বিমান ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার উচ্চতায় এবং প্রতি ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার গতিতে উড়ে যাওয়ার সময় একটি স্বল্প শক্তির ইনফ্রারেড রশ্মির মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রেরণ করে। মাটির সাধারণ সোলার প্যানেলগুলোতে এই শক্তি গ্রহণ করার পর তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা অত্যন্ত গতিশীল এবং প্রতিকূল অবস্থাতেও এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ডিএআরপিএ (DARPA)-এর স্বনামধন্য বিশেষজ্ঞ পল জাফে (Paul Jaffe) সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রচলিত মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির তুলনায় এই ইনফ্রারেড পদ্ধতি অনেক বেশি নিরাপদ এবং অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে শক্তি পৌঁছাতে সক্ষম।

ওভারভিউ এনার্জি তাদের এই পরীক্ষিত প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতে বিশাল পরিসরে মহাকাশীয় সিস্টেমে ব্যবহারের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ভূ-স্থির কক্ষপথে বা প্রায় ৩৫,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় বিশেষ স্যাটেলাইট স্থাপন করা। এই স্যাটেলাইটগুলো মহাকাশে সূর্যের তীব্র আলো সংগ্রহ করবে এবং লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই শক্তি সরাসরি পৃথিবীতে বিদ্যমান সোলার ফার্মগুলোতে পাঠাবে। এর ফলে রাতের অন্ধকার বা মেঘলা আবহাওয়াতেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা বর্তমান সৌরশক্তির সীমাবদ্ধতা দূর করবে। ২০২৮ সালে নিম্ন কক্ষপথে এই প্রযুক্তির একটি প্রাথমিক প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোম্পানিটি আশা করছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে তারা মেগাওয়াট এবং ২০৩০-এর দশকের শেষ নাগাদ গিগাওয়াট স্কেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে অরেলিয়া ইনস্টিটিউট (Aurelia Institute) এবং লোয়ারকার্বন ক্যাপিটাল (Lowercarbon Capital) থেকে ইতিমধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়েছে।

বাজারের অন্যান্য প্রতিযোগী যেমন এমরড (Emrod) বা ইথারফ্লাক্স (Aetherflux)-এর ব্যবহৃত মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের তুলনায় ইনফ্রারেড রশ্মি ব্যবহারের বেশ কিছু কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। এই পদ্ধতিতে নতুন করে কোনো ব্যয়বহুল রেকটেনা (rectenna) বা বিশেষ রিসিভার স্থাপনের প্রয়োজন হয় না, বরং বিদ্যমান সোলার প্যানেলগুলোই ব্যবহার করা যায়। এটি অন্যান্য বেতার তরঙ্গে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বিঘ্ন সৃষ্টি করে না, যা একে পরিবেশবান্ধব এবং জনবহুল এলাকার জন্য উপযোগী করে তুলেছে।

তবে এই প্রযুক্তির কিছু চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতাও রয়েছে যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। যদিও মেঘলা আকাশ বা ঘন কুয়াশার কারণে এই রশ্মি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে গবেষকরা একটি শক্তিশালী সরু রশ্মির পরিবর্তে একটি বিস্তৃত এবং কম তীব্রতার আলোক প্রবাহ ব্যবহার করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ খুঁজে পেয়েছেন। তবে এই প্রক্রিয়ার একটি প্রধান ঝুঁকি হলো কক্ষপথে থাকা অন্যান্য স্যাটেলাইট বা মহাকাশযান এই রশ্মির পথে এলে উত্তপ্ত হতে পারে, যার জন্য ভবিষ্যতে উন্নত সুরক্ষা ও বিশেষ তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।

এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বিশাল আকারের ব্যাটারি স্টোরেজ বা জটিল নিউক্লিয়ার ফিউশনের একটি কার্যকর এবং সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কোনো অতিরিক্ত ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াই বিদ্যমান বিদ্যুৎ গ্রিডে সরাসরি শক্তি সরবরাহ করার এই ক্ষমতা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বণ্টনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। ওভারভিউ এনার্জির এই সফল পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন আমাদের এমন এক নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে, যেখানে মহাকাশ স্টেশনগুলো পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এবং গ্রিডের পিক আওয়ারের চাপ সামলাতে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিজয় নয়, বরং একটি টেকসই এবং সবুজ পৃথিবীর দিকে এক বিশাল পদক্ষেপ।

20 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Энергию передали лучом самолета

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।