গিলি (Geely)-র অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কাওকাও মোবিলিটি (Caocao Mobility) ঘোষণা করেছে যে, ২০২৭ সালের মধ্যেই তারা হাজার হাজার কাস্টমাইজড রোবোট্যাক্সি রাস্তায় নামাতে যাচ্ছে। এই যানগুলো বিশেষভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলার জন্য তৈরি করা হয়েছে—যেখানে প্রথাগত কোনো চালকের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে না। চিনের বড় শহরগুলোর ট্রাফিক ব্যবস্থা মাথায় রেখে এর অভ্যন্তর এবং সেন্সর ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। অটোমোবাইল শিল্পের গত দুই দশকের বিবর্তন লক্ষ্য করলে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পদক্ষেপটিকে দীর্ঘ প্রস্তুতির একটি স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত ফলাফল হিসেবেই মনে হয়।
গিলির এই যাত্রার শুরু হয়েছিল ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন তারা বৈদ্যুতিক গাড়ির রাইড-হেলিং সার্ভিস হিসেবে কাওকাও প্রতিষ্ঠা করে। ২০২০ সাল নাগাদ কোম্পানিটির বহরে ৫০ হাজারেরও বেশি গাড়ি যুক্ত হয়, যার বেশিরভাগই ছিল গিলি এবং লিঙ্ক অ্যান্ড কো (Lynk & Co) ব্র্যান্ডের। বর্তমানে তারা এল-ফোর (L4) পর্যায়ের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রযুক্তিতে প্রবেশ করছে, যেখানে মানুষের হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন থাকবে না। এই রোবোট্যাক্সিগুলো এসইএ (SEA) আর্কিটেকচারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা জিকর (Zeekr) এবং স্মার্ট (Smart) গাড়িতে ইতিপূর্বেই তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ইঞ্জিনিয়াররা বিশেষ করে এই গাড়ি থেকে স্টিয়ারিং হুইল সরিয়ে ফেলেছেন এবং অত্যাধুনিক লিডার ও হাই-প্রিসিশন ম্যাপ এর সাথে যুক্ত করেছেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এখনই কেন এই বিশাল উদ্যোগ? কারণ চিন বর্তমানে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রক ও আইনি প্রস্তুতির ধাপ সম্পন্ন করেছে। ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে বেইজিং, সাংহাই এবং গুয়াংজু-র মতো প্রধান শহরগুলো স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্সি চলাচলের জন্য নির্ধারিত এলাকা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করেছে। গিলি তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাইডু অ্যাপোলো (Baidu Apollo) এবং নিংবো ও গোথেনবার্গের নিজস্ব গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে কয়েক মিলিয়ন কিলোমিটার পরীক্ষামূলক ড্রাইভিং সম্পন্ন করেছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় নীতিও এখানে বড় ভূমিকা পালন করছে, যেখানে কোটি মানুষের বসবাসকারী শহরগুলোতে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে রোবোট্যাক্সিকে একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পে অংশীদারদের বাণিজ্যিক স্বার্থ খুব সুনিপুণভাবে মিলেছে। গিলি তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং স্বায়ত্তশাসিত ড্রাইভিংয়ের দক্ষতাকে সরাসরি আয়ের উৎসে পরিণত করার সুযোগ পাচ্ছে, যা প্রথাগত গাড়ি বিক্রির ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমাবে। অন্যদিক থেকে, কাওকাও-এর জন্য এটি ডিডি (Didi)-র মতো কোম্পানিগুলোর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা এড়িয়ে এক নতুন উচ্চ মুনাফার স্তরে পৌঁছানোর সুযোগ। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে, যারা চায় প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থান বজায় রাখতে। বিষয়টি অনেকটা হান বংশীয় সেই প্রবাদের মতো—"নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হলে বুদ্ধিমানরা পুরনো নৌকা মেরামত না করে নতুন জাহাজ নির্মাণে মনোনিবেশ করেন।"
এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব এই দশকের শেষ নাগাদই সাধারণ মানুষ অনুভব করতে শুরু করবে। রাস্তায় হাজার হাজার রোবোট্যাক্সি চলাচলের ফলে বড় শহরগুলোতে যাতায়াতের খরচ নাটকীয়ভাবে কমে আসবে, যা হয়তো ব্যক্তিগত গাড়ি রাখার চেয়েও সাশ্রয়ী হবে। সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ হলো যাতায়াতের সময় আরও বেশি স্বাধীনতা এবং মানুষের ভুলের কারণে ঘটা দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে মুক্তি। তবে এই নতুন প্রযুক্তির আগমনে প্রথাগত ট্যাক্সি চালকদের জীবিকা সংকটের মুখে পড়তে পারে—তাই তাদের নতুন কাজের উপযোগী করে তোলা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের বিষয়টি বর্তমানে আঞ্চলিক নীতি নির্ধারকদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কাওকাও-এর এই পরিকল্পনা এটিই স্পষ্ট করে যে, স্বয়ংক্রিয় যান তৈরির প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু এখন এশিয়ার দিকে দ্রুত সরে আসছে। যখন ইউরোপ এবং আমেরিকা বিভিন্ন আইনি ও নৈতিক জটিলতা সমাধানে সময় ব্যয় করছে, তখন চিনা কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফেলছে। বিশ্ব অটোমোবাইল শিল্পের জন্য এটি একটি বড় বার্তা—হয় তাদের এই কাস্টমাইজড রোবোট্যাক্সি প্ল্যাটফর্ম দ্রুত আয়ত্ত করতে হবে, না হলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এক সময়ের ভলভো (Volvo) এবং লোটাস (Lotus)-এর মতো ব্র্যান্ড কিনে নেওয়া গিলি এখন সারা বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে পরিবহন খাতের ভবিষ্যৎ কেমন হওয়া উচিত।
পরিশেষে, ২০৩০ সাল নাগাদ কাওকাও তাদের বহরে ১,০০,০০০ রোবোট্যাক্সি যুক্ত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর জন্য চার্জিং অবকাঠামো এবং রক্ষণাবেক্ষণের নতুন পরিকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। যদি কারিগরি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঝুঁকিগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা যায়, তবে আমরা দেখব কীভাবে রোবোট্যাক্সি একটি পরীক্ষামূলক ধারণা থেকে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এটি কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়, বরং আধুনিক নগরজীবনের এক অনিবার্য বাস্তব। কারণ ভবিষ্যতের গাড়ি শুধুমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এটি মেগাসিটির জীবনধারার সাথে মিশে থাকা একটি অত্যাধুনিক মোবাইল সার্ভিস।



