রোবোটিক্সের জগত এখন এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে মেশিনগুলো আর কেবল পূর্ব-নির্ধারিত স্ক্রিপ্টের ওপর নির্ভর করবে না। বরং তারা ভৌত জগতের জটিলতা বুঝতে এবং নেভিগেট করতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ 'কল্পনাশক্তি' ব্যবহার করবে। নরওয়েজিয়ান-আমেরিকান স্টার্টআপ ১এক্স টেকনোলজিস (1X Technologies) তাদের নিও (Neo) হিউম্যানয়েড রোবটের জন্য ১এক্স ওয়ার্ল্ড মডেল (1XWM) মোতায়েন করার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনে এক ধাপ এগিয়ে গেছে। একটি ওয়ার্ল্ড মডেল মূলত একটি এআই-চালিত অভ্যন্তরীণ সিমুলেটর, যা কোনো রোবটকে তার কাজ করার আগেই তার ভৌত ফলাফল অনুমান করতে সাহায্য করে—ঠিক যেমন একজন মানুষ বল ধরার আগে তা ধরার দৃশ্যটি মনে মনে কল্পনা করে নেয়। এই উদ্ভাবন রোবট প্রশিক্ষণের পদ্ধতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনছে, যেখানে মানুষের রিমোট কন্ট্রোল বা টেলিঅপারেশনের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশাল পরিমাণ ভিজ্যুয়াল ডেটা থেকে শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই উদ্ভাবনের মূলে রয়েছে একটি টেক্সট-কন্ডিশন্ড ডিফিউশন মডেল, যা উন্নত ভিডিও জেনারেটরের মতো সাধারণ লিখিত বর্ণনা থেকে জটিল দৃশ্য তৈরি করতে সক্ষম। ১এক্স টেকনোলজিস এই মডেলটিকে শত শত ঘণ্টার 'ইগোসেন্ট্রিক' বা প্রথম-ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণ করা মানুষের ভিডিওর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যাতে নিও বুঝতে পারে মানুষ কীভাবে স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন বস্তু নাড়াচাড়া করে। নিও-র নিজস্ব শারীরিক গঠন এবং গতিবিদ্যার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই সিস্টেমটিকে আরও সূক্ষ্মভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এটি সাধারণ ভয়েস বা টেক্সট কমান্ডকে শারীরিক নড়াচড়ায় রূপান্তর করতে পারে। কোনো কাজ করার আগে এআই প্রথমে নিজের সেই কাজটি সম্পন্ন করার একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও 'কল্পনা' করে এবং এরপর একটি ইনভার্স ডায়নামিক্স মডেল (IDM) ব্যবহার করে সেই কল্পিত দৃশ্যের সাথে মিল রেখে প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগ করে বাস্তবে কাজটি সম্পন্ন করে।
এই পদ্ধতিটি মূলত 'ডেটা বটলনেক' বা তথ্যের সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যা রোবোটিক্সের অগ্রগতির পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। সাধারণত সাধারণ কাজের জন্যও হাজার হাজার ঘণ্টার ম্যানুয়াল প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। নিও-র গঠন মানুষের মতো এবং এর নড়াচড়া বেশ নমনীয় ও জৈব-অনুপ্রাণিত হওয়ায় ১এক্স টেকনোলজিস দাবি করছে যে, এটি মানুষের পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়ার ভিডিও থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে। সাম্প্রতিক প্রদর্শনীতে নিও-কে রান্নাঘরের কাজ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বিভিন্ন বস্তু নাড়াচাড়া করতে দেখা গেছে। কোম্পানিটি ধারণা করছে যে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কাপড় ধোয়া বা সূক্ষ্ম গৃহস্থালি সহায়তার মতো জটিল কাজেও কোনো পূর্ব-প্রশিক্ষণ ছাড়াই পারদর্শী হয়ে উঠবে। এই 'জেনারালাইজেশন' বা নতুন পরিস্থিতিতে শেখা যুক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতাকে রোবটের স্বায়ত্তশাসিত বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রোবটটির শারীরিক কাঠামোও এর বুদ্ধিমত্তার মতোই উন্নত এবং আধুনিক। নিও-র উচ্চতা প্রায় ১৬৭–১৬৮ সেমি (৫ ফুট ৬ ইঞ্চি) এবং ওজন ৩০ কেজি। এটি ১এক্স নিও কর্টেক্স (1X Neo Cortex) দ্বারা পরিচালিত, যা রিয়েল-টাইম এআই প্রসেসিংয়ের জন্য উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন চিপসেট ব্যবহার করে। এর ব্যাটারি কয়েক ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সুবিধা দেয়। এছাড়া এর নরম নকশা এবং টেক্সটাইল স্যুট এটিকে ঘরোয়া বা পেশাদার পরিবেশে একটি নিরাপদ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ উপস্থিতি হিসেবে উপস্থাপন করে। বাড়িতে ক্যামেরা-যুক্ত রোবট ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার উদ্বেগের কথা মাথায় রেখে কোম্পানিটি বিশেষ নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং টুলস তৈরি করেছে, যা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করবে।
২০২৬ সালে মার্কিন বাজারে প্রাথমিক সরবরাহ শুরু করার মাধ্যমে ১এক্স টেকনোলজিস এখন বৃহৎ পরিসরে শিল্প ও গৃহস্থালি ব্যবহারের দিকে মনোনিবেশ করছে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইকিউটি (EQT)-এর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কোম্পানিটি ২০৩০ সালের মধ্যে লজিস্টিকস, ম্যানুফ্যাকচারিং এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে হাজার হাজার নিও ইউনিট মোতায়েন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যদিও বর্তমানে অত্যন্ত জটিল বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে রিমোট তদারকির প্রয়োজন হতে পারে, তবে ২০২৬ সাল নাগাদ এর স্বায়ত্তশাসিত সক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। মানুষের চলাফেরার বৈশ্বিক আর্কাইভকে এআই-এর শ্রেণীকক্ষে পরিণত করার মাধ্যমে ১এক্স টেকনোলজিস প্রমাণ করতে চাইছে যে, রোবোটিক্সের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মেশিনের শেখার, খাপ খাইয়ে নেওয়ার এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চমাত্রার স্বাধীনতার সাথে বিশ্বকে নেভিগেট করার ক্ষমতার ওপর।



