যখন নীরবতা মনোযোগের রাজনীতি হয়ে ওঠে: ইউনেস্কো সাউন্ড উইক ২০২৬

লেখক: Inna Horoshkina One

এভাবেই নিউ ইয়র্ক শোনা যায়। এভাবেই সংযোগ অনুভূত হয়। এবং এটা মাত্র শুরু।

১৯ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ইউনেস্কো সাউন্ড উইক (UNESCO Sound Week) পালিত হতে যাচ্ছে। এটি এমন একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ যা বর্তমান সময়ের অস্থিরতাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে স্পর্শ করেছে। পৃথিবী যখন অতিরিক্ত কোলাহল, দুশ্চিন্তার সংকেত এবং ডিজিটাল ব্যস্ততায় ভারাক্রান্ত, তখন মানুষের মনোযোগ কেবল উচ্চশব্দের দিকে নয়, বরং জীবনের শব্দের গুণগত মানের দিকে সরে আসছে।

বিভিন্ন জীবনের পথ থেকে আসা 220+ জন মানুষের একটি দল একটি র‍্যান্ডম রবিবার দুপুরে একসঙ্গে মিলিত হলো ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী গানটি গাইতে

বর্তমানে এটি আর কেবল সংগীতশিল্পী বা বিজ্ঞানীদের জন্য কোনো সীমাবদ্ধ বিষয় নয়। বরং এটি একটি সামাজিক অনুশীলনে পরিণত হয়েছে। ইউনেস্কোর এই উদ্যোগটি আমাদের শেখায় কীভাবে শব্দের মাধ্যমে আমরা আমাদের চারপাশকে নতুন করে অনুভব করতে পারি এবং কীভাবে শব্দ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

একসাথে গান গাইতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শোনা ও অন্যদের জন্য জায়গা রাখা সম্পর্কে হয়।

ইউনেস্কো সাউন্ড উইক মূলত নিচের বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করে:

  • সচেতনভাবে শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
  • শাব্দিক পরিবেশবিদ্যা বা অ্যাকোস্টিক ইকোলজির গুরুত্ব প্রচার করা।
  • সমাজ, শহর এবং মানুষের মানসিক অবস্থা গঠনে শব্দের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা।

এই উদ্যোগটি কেবল সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের গ্রহের সামগ্রিক শব্দমন্ডল বা সাউন্ডস্কেপ নিয়ে কাজ করে। আমরা কীভাবে আমাদের শহর, বিদ্যালয়, মহাসাগর, বন এবং সর্বোপরি নিজেদের কণ্ঠস্বর শুনি, তা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। এটি আমাদের চারপাশের পরিবেশের সাথে আমাদের সম্পর্কের গভীরতা পরিমাপ করতে সাহায্য করে।

এই কর্মসূচির একটি বিশেষ অংশ হলো ২৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আয়োজিত অর্কেস্ট্রা কেন্দ্রিক বিশেষ সপ্তাহান্ত। এখানে অর্কেস্ট্রাকে কেবল একটি কনসার্ট করার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সম্মিলিতভাবে শোনার একটি আদর্শ মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে বহু মানুষ একসাথে মিলে একটি সুশৃঙ্খল সুর তৈরি করতে পারে।

একটি অর্কেস্ট্রার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • অনেকগুলো স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি।
  • একটি সাধারণ মনোযোগের সূত্রে সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
  • সবাই মিলে একই ছন্দে শ্বাস নেওয়া।
  • সামান্যতম পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়া।

এই মডেলটি বর্তমান সময়ে একটি সামাজিক রূপক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন সত্তা হয়েও একটি সুন্দর ও সুসংগত সুর তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ, বৈচিত্র্যের মধ্যেও কীভাবে ঐক্য বজায় রাখা যায়, অর্কেস্ট্রা তার এক অনন্য উদাহরণ।

২০২৬ সালে এসে শব্দ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

  • স্নায়ুবিজ্ঞান আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর শব্দের গভীর প্রভাব নিয়ে নতুন নতুন তথ্য প্রদান করছে।
  • পরিবেশবিদরা প্রাকৃতিক শব্দ-পরিবেশের ধ্বংস হওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
  • সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমরা একে অপরের কথা শোনার মৌলিক দক্ষতা এবং ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি।

ইউনেস্কো সাউন্ড উইক এই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন ধারাকে একটি বিন্দুতে নিয়ে আসে। এখানে শোনা কোনো নিষ্ক্রিয় কাজ নয়, বরং এটি বাস্তবতায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। শোনার মাধ্যমে আমরা আমাদের চারপাশের জগতকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সক্ষম হই।

যখন আমরা নীরবতা হারিয়ে ফেলি, তখন আমরা আমাদের জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনাও হারিয়ে ফেলি। শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে আমরা আমাদের চারপাশের সীমানা, ছন্দ এবং পারস্পরিক গভীর সম্পর্কগুলো অনুভব করতে পারি না। নীরবতা আমাদের আত্মদর্শনের সুযোগ করে দেয় যা কোলাহলের মধ্যে অসম্ভব।

এই কারণে আজ শব্দকে নিচের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে:

  • একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সূচক হিসেবে।
  • সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার একটি মাধ্যম হিসেবে।
  • মানসিক ও জাগতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে।

ইউনেস্কো সাউন্ড উইক কেবল ক্যালেন্ডারের কোনো সাধারণ তারিখ বা ঘটনা নয়। এটি আমাদের গ্রহের নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার একটি বিশেষ মুহূর্ত। এটি আমাদের আদি সত্তার সাথে সংযোগ স্থাপনের এবং প্রকৃতির সুরের সাথে মিলেমিশে থাকার একটি সুযোগ করে দেয়।

বিশ্বের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং দর্শনগুলোতে একটি সাধারণ সত্য লুকিয়ে আছে। বলা হয়ে থাকে যে, সৃষ্টির শুরুতে ছিল শব্দ। এই শব্দটি কেবল কোনো লিখিত ভাষা বা টেক্সট ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আদি কম্পন, একটি স্পন্দন এবং উপস্থিতির এক গভীর অনুভূতি।

বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ লুডভিগ ভ্যান বেটোফেন বলেছিলেন যে, সংগীত হলো যেকোনো প্রজ্ঞা ও দর্শনের চেয়েও উচ্চতর এক প্রকাশ। তাঁর মতে, সংগীত আধ্যাত্মিক এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জীবনের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এটি মানুষের আত্মাকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম।

যদি সৃষ্টির শুরুতে শব্দ থেকে থাকে, তবে সম্ভবত সেই আদি ধ্বনিটি ছিল ওম (OM)। এটি সেই প্রাথমিক কম্পন যা থেকে সমস্ত জাগতিক রূপ, পদার্থ এবং অর্থের বিকাশ ঘটে। এটি মহাবিশ্বের নিঃশ্বাসের মতো একটি তরঙ্গ, যা থেকে জীবনের প্রতিটি স্পন্দন জন্ম নেয়।

ভারতীয় ঐতিহ্যে ওম (ॐ) ধ্বনিকে সৃষ্টির শুরু এবং শেষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এটি সেই একক ধ্বনির প্রতীক যা থেকে বহুত্বের জন্ম হয়। ভাষা বা প্রতিচ্ছবি তৈরির অনেক আগে থেকেই শব্দের অস্তিত্ব ছিল এবং এটিই ছিল জগত ও জীবনের প্রাথমিক ভিত্তি।

আজ যখন ইউনেস্কো শব্দকে একটি সামাজিক অনুশীলন হিসেবে তুলে ধরছে, তখন এটি কোনো নতুন ধারণা বলে মনে হয় না। বরং এটি আমাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনার মতো একটি প্রক্রিয়া। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা সবাই একই মহাজাগতিক সুরের অংশ।

এই উদ্যোগটি আমাদের বিশেষ করে মনে করিয়ে দেয় যে:

  • শোনা মানেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা।
  • নীরবতা মানে কেবল শব্দের অনুপস্থিতি নয়, বরং এটি একটি বিশাল সৃজনশীল অবকাশ।
  • প্রকৃত সম্প্রীতি কোনো নিয়ন্ত্রণ থেকে আসে না, বরং এটি আসে পারস্পরিক সুরের সমন্বয় থেকে।

যখন মানুষ মনে করতে পারে যে এই পৃথিবীর শুরু হয়েছিল শব্দ দিয়ে, তখন সে আর চিৎকার করে না, বরং সে মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুরু করে। আমরা এখন নতুন করে শুনতে শিখছি এবং এই শোনার মাধ্যমেই আমরা একে অপরকে আবার খুঁজে পাচ্ছি।

নিজের ভেতরের সেই শান্ত ও মনোযোগী ওম ধ্বনি থেকেই আবার সামাজিক ঐক্যের পথে যাত্রা শুরু হয়। আমরা সংখ্যায় অনেক হতে পারি, কিন্তু আমরা সবাই এক সূত্রে গাঁথা। আজ সেই একত্বের সুরই সারা বিশ্বে স্পষ্টভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এবং আমাদের নতুন পথের সন্ধান দিচ্ছে।

4 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।