২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি মিলানের একটি আদালত প্রখ্যাত উদ্যোক্তা এবং ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সার কিয়ারা ফেরাগ্নির বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার মামলার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের এই আইনি লড়াই মূলত ক্রিসমাস প্যান্ডোরো কেক এবং ইস্টার এগ সম্পর্কিত বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচারণাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল, যা এখন আদালতের রায়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত সমাপ্তি লাভ করল। এই রায়ের ফলে ইতালির অন্যতম প্রভাবশালী এই ব্যক্তিত্বের ওপর থেকে দীর্ঘদিনের আইনি চাপ অপসারিত হলো।
এই বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বরে, যখন সাংবাদিক সেলভাজিয়া লুকারেলি তুরিনের রেজিনা মার্গেরিটা শিশু হাসপাতালের জন্য প্যান্ডোরো বিক্রির লভ্যাংশ দান করার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, প্রচারণা শুরুর আগেই প্রস্তুতকারক সংস্থা বালোস্কো (Balocco) মাত্র ৫০,০০০ ইউরো একটি নির্দিষ্ট অনুদান হিসেবে প্রদান করেছিল। অথচ কিয়ারা ফেরাগ্নির কোম্পানিগুলো এই বাণিজ্যিক প্রচারণা থেকে ১০ লক্ষ ইউরোরও বেশি মুনাফা অর্জন করেছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ফেরাগ্নি নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে, প্রচারণার ক্ষেত্রে একটি "যোগাযোগের ভুল" হয়েছিল।
আদালতের এই খালাস প্রদানের বিষয়টি মূলত একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে, যার অর্থ এই নয় যে প্রতারণার মূল অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আদালত অনলাইন গ্রাহকদের জন্য "হ্রাসকৃত সুরক্ষা" সংক্রান্ত বিশেষ গুরুতর পরিস্থিতি বা অভিযোগটি গ্রহণ করেনি। এর ফলে অভিযোগটি গুরুতর প্রতারণা থেকে সাধারণ প্রতারণার পর্যায়ে পুনর্মূল্যায়িত হয়। যেহেতু সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী সংস্থাগুলোকে ইতিমধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে, তাই তারা তাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে ফেরাগ্নি এবং তার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাবিও দামাতোর বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইতালীয় প্রতিযোগিতা কর্তৃপক্ষ (AGCM) 'প্যান্ডোরো পিঙ্ক ক্রিসমাস' প্রচারণায় অন্যায্য বাণিজ্যিক আচরণের দায়ে ফেরাগ্নির কোম্পানি এবং বালোস্কো উভয়কেই মোটা অংকের জরিমানা করেছিল। ফেরাগ্নির কোম্পানিগুলো জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ মোট প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন ইউরো প্রদান করেছে। এই বিশাল অংকের মধ্যে রেজিনা মার্গেরিটা হাসপাতালে সরাসরি ১ মিলিয়ন ইউরো অনুদান হিসেবে প্রদান করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা মূলত জনরোষ প্রশমনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ইতালিতে "প্যান্ডোরোগেট" নামে পরিচিতি পাওয়া এই কেলেঙ্কারি দেশটির আইন ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছে। ইতালি সরকার এখন ৫ লক্ষের বেশি অনুসারী থাকা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য স্বচ্ছতার কঠোর নিয়ম প্রবর্তন করেছে। নতুন আইন অনুযায়ী, এই ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এখন থেকে ইতালীয় যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (AGCOM)-এ নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক। উল্লেখ্য যে, মিলানের প্রসিকিউটররা প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ফেরাগ্নি এবং দামাতোর জন্য এক বছর আট মাসের কারাদণ্ডের সুপারিশ করেছিলেন।
ইনস্টাগ্রামে প্রায় ২৮ মিলিয়ন অনুসারী থাকা কিয়ারা ফেরাগ্নি আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর গভীর স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে জানান যে, তার জন্য এই দীর্ঘস্থায়ী "দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে" এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকার জন্য তিনি তার অনুসারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই মামলাটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং এবং দাতব্য প্রচারণার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এই খাতের স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



